মেধা পাচার!

আনোয়ারুল হক নিজামী

 

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছরই অসংখ্য শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই পড়াশোনা শেষ করে সেখানে চাকরিতে ঢুকে পরবর্তী সময়ে সেখানকার স্থায়ী নাগরিক হয়ে যান। এভাবে বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থী হারাচ্ছে। একজন মেধাবী দেশে যখন তাঁর যোগ্যতা অনুসারে চাকরি না পান, তখন তিনি হতাশ হবেন—এটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে নিরাপদ, সচ্ছল জীবনযাপনের জন্য তিনি যদি বিদেশে যান, তবে তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না। কাজেই বিদেশে মেধা পাচার রোধে দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মেধাবীদের যথাযথ মূল্যায়নে এখনই সচেতন হতে হবে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে তাঁদের নিয়োজিত করতে হবে দেশের কল্যাণে।

উচ্চ শিক্ষালয়গুলোর নিয়ন্ত্রক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সবশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য দিয়ে শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে ব্যয় সামঞ্জস্য করার ক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। মেডিক্যাল, বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং, পিএইচডি ও অন্যান্য শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তহবিল ছাড়াও সরকারের রাজস্ব খাত থেকে বড়ো একটা অংশ ব্যয় করতে হয়। এই শিক্ষার্থী তার শিক্ষাজীবন শেষে দেশের কল্যাণে কাজ করবে—এটাই দেশ চায়। অথচ বড়ো বড়ো ডিগ্রি অর্জন করে তারা বিদেশে পাড়ি জমিয়ে ঐদেশের সেবা করছে। আমাদের দেশের মানুষের করের টাকায় অর্জন করা মেধা চলে যাচ্ছে অন্যদেশে!

কিন্তু কেন চলে যাচ্ছে মেধাবীরা—এই প্রশ্ন সবার। গভীর পর্যবেক্ষণে দেখা যায় আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তাহীনতাসহ বিকশিত হওয়ার অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে এমনটা ঘটছে। উন্নত দেশের গবেষণা, প্রযুক্তি আর স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে এই মেধাবীরাই সেসব দেশকে করেন আরো শক্তিশালী, পরাক্রমশালী। ছাত্রাবস্থায় অথবা কর্মজীবনের শুরুতেই তাদের এক বিশাল অংশ বিদেশে যাওয়ার চেষ্টায় থাকে। একসময় চলেও যায়। মেধার বিকাশ ঘটাতে গুণগত শিক্ষা আর উন্নত গবেষণার দরকার আছে। তাছাড়া প্রতিযোগী না থাকলে প্রতিযোগিতা জমে না।

বিশ্বায়নের যুগে তাল মেলাতে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে ঠিকই। তবে তাঁরা যদি দেশ থেকে হারিয়ে যান, এটা মেধা পাচার। দেশের মাটিতে বড়ো হয়ে, উচ্চশিক্ষা নিয়ে, পরে শিক্ষকতাসহ প্রথম সারির বিভিন্ন পেশার কর্মক্ষেত্র ছেড়ে বিদেশে গমন। ভিন দেশের উন্নত গবেষণা ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের আরো যোগ্য করেন। অনেকেই পারেন, কেউবা পারেন না। তবু যেন হাল ছাড়া নয়, থিতু হয়ে পড়ে থেকে সেসব দেশে স্থায়ী হয়ে যান। দেশকে নিয়ে ভাবেন, কেউ দেশের জন্যও কাজ করেন।

উন্নত বিশ্বে শিক্ষা ও গবেষণায় রাজনীতির ভিন্ন ভিন্ন রং নেই। জাতি তৈরির মহান পেশা শিক্ষক হতে হলুদ-বেগুনি, সাদা দল নয়, যোগ্যতা ও গবেষণার মানই মুখ্য। বিশ্ববিদ্যালয় আর বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষকেরা দিনরাত কাজ করেন আবিষ্কারের নেশায়। শিক্ষা ও গবেষণায় অর্জিত ফসল ছড়িয়ে যাচ্ছেন সবার কাছে। কৃষি, শিল্পকারখানায় সব জায়গায়। বিদেশের মাটিতে ওদের সঙ্গে মিশে প্রতিযোগিতায় আমরাও পারি। দেশেও সম্ভব। নিজ জায়গায় স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধের খুব দরকার। রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। উন্নয়নশীল দেশের জন্য তুখোড় মেধাবীদের সুবিধা দিয়ে দেশের জন্য কাজে লাগাতে হবে।

১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র এসএসসি ও এইচএসসি-তে সারা দেশের সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অর্জনকারী আরিফুল হক নিহত হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন প্রভোস্ট ও শিক্ষক সমিতির সভাপতি পদত্যাগ করে শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ করার সুপারিশ করেছিলেন, যা বর্তমান সময়ে ভাবাও যায় না।

চট্টগ্রাম