সালাহউদ্দিন মো. রেজা, চট্টগ্রাম অফিস
হাইড্রোপনিক বা মাটিবিহীন পানিভিত্তিক চাষাবাদ পদ্ধতিতে সারা বছর আপনার প্রয়োজনীয় শাকসবজি, ফলমূল চাষাবাদ করা যায়। এর জন্য যেমন চাষাবাদযোগ্য জমির প্রয়োজন হয় না। একইভাবে মাটির সংস্পর্শ ছাড়াই ফসল উত্পাদন হয় বিধায় কীটপতঙ্গের তেমন একটা আক্রমণ না হওয়ায় কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এই ধরনের চাষাবাদে সাফল্য পেয়েছে। তারই আলোকে হাইড্রোপনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ব্যবহার করে সবজি ও ফলমূল উত্পাদন জনউদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। মাটি ছাড়া কৃত্রিম পরিবেশে গাছ চাষের পদ্ধতিকে হাইড্রোপনিক পদ্ধতি বলা হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ অত্যধিক জনবহুল দেশ হওয়ায় এখানে চাষাবাদের জমি দিন দিন কমে আসছে। ঘরবাড়ি, শিল্পকারখানা, রাস্তাঘাটসহ মানুষের প্রয়োজনে প্রতি বছর বিপুল আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাই আবাদি জমি সংকুচিত হওয়ার মূল কারণ। তাই বাড়তি জনসংখ্যা মোকাবিলার জন্য আবাদি জমির ওপর চাষাবাদনির্ভর হলে চলবে না। এক্ষেত্রে অনাবাদি জমিসহ বাসাবাড়ির ছাদ, অব্যবহূত স্থানকে চাষের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এই চিন্তা থেকেই মূলত হাইড্রোপনিক চাষাবাদ পদ্ধতির উদ্ভাবন হয়েছে বলে জানা যায়। দেশব্যাপী হাইড্রোপনিক চাষ পদ্ধতির মাধ্যমে শবজি, ফুল ও ফলের চাষাবাদ দেশের অর্থনীতি খাতেও বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে।
পাহাড়তলী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হারুন উর রশিদ জানান, হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পানিতে গাছের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদান সরবরাহ করে ফসল উত্পাদন করা হচ্ছে। তিনি জানান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সবজি বিভাগ হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে মাটিবিহীন বড়ো স্টিলের বা প্লাস্টিকের ট্রেতে পানির মধ্যে গাছের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদানসমূহ সরবরাহ করে টম্যাটো, ক্যাপসিকাম, লেটুস, ফুলকপি, ব্রোকলি, করলা, খাটো শিপ, শসা, খিরা এবং স্ট্রবেরি, গাঁদা, গোলাপ ইত্যাদি সাফল্যজনকভাবে উত্পাদন করছে। চট্টগ্রাম পাহাড়তলী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র ইরই মধ্যে এর অনেকগুলো ফলন সাফল্যের সঙ্গে উত্পাদন করতে পেরেছে। হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফসল উত্পাদনের সুবিধাদির মধ্যে রয়েছে—হাইড্রোপনিক মাটিবিহীন চাষাবাদ পদ্ধতি হওয়ায় মাটিবাহিত বা কৃমিজনিত কোনো রোগ হয় না। অনাবাদি জমিকেও চাষাবাদের আওতায় আনা যায়। যেকোনো ফাঁকা জায়গায় চাষাবাদ করা যায়। আলাদাভাবে সার ও সেচের প্রয়োজন হয় না। নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে চাষাবাদ হয় বিধায় কীটপতঙ্গের আক্রমণ অনেকটা কম হয়। ফলে কীটনাশকের ব্যবহার প্রয়োজন পড়ে না। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে যেকোনো মৌসুমে অর্থাত্ সারা বছর সবজি, ফুল ও ফল চাষ করা যায়। ঘরের বারান্দা, ছাদসহ পরিচ্ছন্ন পরিবেশে চাষাবাদ করা যায়।
কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের পদ্ধতি অনুযায়ী একটি প্লাস্টিকের পট নিয়ে নিচের অংশে চার-পাঁচটি ছিদ্র করতে হবে। পরে পটের মধ্যে নারকেলের আঁশের গুঁড়া নিতে হবে। এবং প্লাস্টিকের পটের মধ্যে একটি করে বীজ বপন করতে হবে। বীজ বপনের পর পটের উপরিভাগ একটি খবরের কাগজ দিতে হবে। বীজ অংকুরিত হওয়ার পর কাগজ সরিয়ে নিতে হবে। এরপর প্রতি দিন অল্প অল্প করে পানি দিতে হবে। এই পদ্ধতিতে গাছের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদানসমূহ যথাযথ মাত্রায় পানিতে মিশিয়ে একটি ট্যাংকিতে নেওয়া হয় এবং পাম্পের সাহায্যে পাইপের মাধ্যমে ট্রেতে পুষ্টি দ্রবণ নির্দিষ্ট সময় পরপর সঞ্চালন করে ফসল উত্পাদন করা হয়। এক্ষেত্রে প্রতি দিন সাত-আট ঘণ্টা পাম্পের সাহায্যে এই সঞ্চালন প্রক্রিয়া চালু রাখা দরকার। এই পদ্ধতিতে প্রাথমিকভাবে প্রথম বছর ট্রে, পাম্প এবং পাইপের আনুষঙ্গিক খরচ বেশি হলেও পরবর্তী বছরসমূহে খরচ কমে আসে। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এই পদ্ধতিতে ক্যাপসিকাম ও লেটুসপাতার চাষ করেছে। তাছাড়া নারকেলের আঁশে উত্পাদিত চারা দিয়ে স্ট্রবেরি টম্যাটোর চাষাবাদও করেছে।