দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের মোট চাহিদার চেয়ে উত্পাদন ক্ষমতা বেশি। চলতি জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে উত্পাদন শুরু করবে বড়ো প্রকল্পের পায়রা বিদ্যুেকন্দ্র। আরো কয়েকটি কেন্দ্রও চলতি বছর উত্পাদনে আসবে। সব মিলিয়ে দেশে বিদ্যুতের উত্পাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। অথচ এর পরও দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড়ো অংশ গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুতে ভরসা রাখতে পারছে না। খরচ বেশি হলেও নিজস্ব ব্যবস্থায় উত্পাদিত ক্যাপটিভ বিদ্যুতেই নির্ভর করছে। এ জন্য লো ভোল্টেজ, ভোল্টেজের উঠানামা এবং লোডশেডিংকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা জানান, পরিকল্পনা-বাস্তবায়নে সমন্বয় না থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উত্পাদনে বড়ো বিনিয়োগ ও প্রচেষ্টা থাকলেও তার সমান্তরালে সঞ্চালন ও বিতরণ পর্যায়ে কাজ হয়নি। উত্স জ্বালানিতেও (ডিজেল, ফার্নেস, গ্যাস, কয়লা ও নবায়নযোগ্য) রক্ষা হয়নি ভারসাম্য। অনেক কেন্দ্র নির্মাণ ও সংস্কারে মানসম্পন্ন মেশিনারিজ ব্যবহূত হয়নি। ফলে বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর উত্পাদন ক্ষমতা কাগজে-কলমে চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও প্রকৃতপক্ষে তা নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না।
এ প্রেক্ষাপটে ক্ষতি হচ্ছে তিন দিক থেকে। এক. উত্পাদন না করলে বা কম করলেও ক্যাপাসিটি চার্জ নিচ্ছে বেসরকারি বিদ্যুত্ কেন্দ্রগুলো। এতে জনগণের অর্থের অপচয় হচ্ছে। দুই. উত্পাদন কম হওয়ায় কেন্দ্র মালিক বা বিনিয়োগকারীরা কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পাচ্ছেন না। তিন. বিপুল বিনিয়োগ করে সরকারি কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি অব্যবহূত থাকে কিংবা অলস পড়ে থাকে। এতেও বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি গুনছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। সর্বোপরি, সরকারি-বেসরকারি সব বিনিয়োগ বিবেচনায় নিয়েই বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এই অলস বিনিয়োগের খরচের খড়গ জনগণের উপরই পড়ে। ফলে গত একদশকে প্রায় প্রতি বছরই বিদ্যুতের মূল্য বেড়েছে। বিদ্যুত্ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গ্রিডভিত্তিক অন্তত ১৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে পারে কেন্দ্রগুলো। এর বিপরীতে দেশে সর্বোচ্চ চাহিদা ১২ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু গ্রিড বিদ্যুতে স্থিতিশীলতা না থাকায় সরকারি-বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুত্ উদ্বৃত্ত থাকলেও তা নিতে পারছে না শিল্পপ্রতিষ্ঠান। যদিও দেশে প্রায় ৩ হাজার শিল্প গ্যাস ও ডিজেল থেকে ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করছে। অর্থাত্ গ্রিডে যে পরিমাণ বিদ্যুত্ উদ্বৃত্ত রয়েছে তা দিয়েই শিল্পের চাহিদা মেটানো যায়। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন সরবরাহের নিশ্চয়তা না থাকায় তা কাজে আসছে না।
গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে থাকা কয়েকটি কারখানা মালিক জানান, তাদের অনেকেই গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুতের উপর নির্ভর করেছিলেন। কিন্তু লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি লো ভোল্টেজ এবং ভোল্টেজের উঠানামার কারণে আর্থিক ক্ষতি বেড়ে যায়। তাই তারা খরচ বেশি হলেও ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ঝুঁকেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুধু বিদ্যুিবভ্রাটের কারণে তাদের মাসে ৫০ থেকে ১৭৫ ঘণ্টা পর্যন্ত উত্পাদন বন্ধ রাখতে হয়। এছাড়া ভোল্টেজের ওঠানামার কারণে মেশিনারিজের ক্ষতি হয়।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি জরিপ চালায়। তাতে দেখা যায়, লোডশেডিংয়ের কারণে গাজীপুরের কারখানা বছরে ৪৩৮ ঘণ্টা, চট্টগ্রামের ৩৩৮ ঘণ্টা, সাভারের ৩৩০ ঘণ্টা এবং নারায়ণগঞ্জের কারখানাগুলো ২৯২ ঘণ্টা বন্ধ থাকে। এই অনিশ্চয়তার কারণে শিল্প-কারখানাগুলো ক্যাপটিভ নির্ভরতা থেকে বের হতে পারছে না।
এদিকে বিদ্যুেকন্দ্রগুলো ক্ষমতার অর্ধেকও উত্পাদন করতে না পারলেও ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি)। সর্বশেষ অর্থবছরে (২০১-১৯) বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে ৮ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা পরিশোধ করে সরকারি সংস্থাটি। এটি আগের বছরের চেয়ে ৪৩ শতাংশ বেশি। চলতি ২০১৯-২০ বর্ষে এ পরিমাণ আরো বাড়বে বলে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে জানিয়েছে সংস্থাটি। গত একদশকে অন্তত ৫১ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ বাবদ খরচ করে পিডিবি। সবমিলিয়ে যে বিদ্যুত্ গ্রিডে যুক্ত হয়নি, গ্রাহকের কাছে যায়নি তার জন্যও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে বাধ্য হচ্ছে পিডিবি। আর ওই খরচের চাপ পড়ছে গ্রাহকদের উপর। দফায় দফায় বাড়ছে বিদ্যুতের দাম।