চন্দ্রনাথে ভয়ানক একদিন...

‘ভ্রমণ প্রথমে তোমাকে নির্বাক করে দেবে, তারপর তোমাকে গল্প বলতে বাধ্য করবে।’—কথাটি ইবনে বতুতার। আসলেই তাই! নানা জায়গায় ঘুরছি-ফিরছি আর নিজের ভেতর গল্পের উদ্ভব হচ্ছে অহরোহ। কিছুদিন আগে ঘুরে এলাম চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডু পাহাড় থেকে, যাকে চন্দ্রনাথ পাহাড়ও বলে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডু শহরের পূর্বে অবস্থিত এই পাহাড় প্রায় ১১৫২ ফুট অথবা ৩১০ মিটার উঁচু।

অনেকবার পাহাড় দেখা হলেও পাহাড়ের শৃঙ্গে চড়ে মাথার কাছাকাছি মেঘ দেখা হয়নি কখনো। তাই কয়েকজন মিলে পরিকল্পনা শুরু করলাম। কিন্তু এই পাহাড়ে ওঠা নেহায়েত দুঃসাহসিক চিন্তা। ভয়ঙ্কর খাঁড়া সিঁড়ি আর দুর্গম পাহাড়ি রাস্তা, মেয়েরা ওখানে উঠতে কোনোভাবে পারবেই না!

এ রকম নানা প্রতিকূল ভাবনার অবসান ঘটিয়ে আমরা ৪ জন মেয়ে অনড় ছিলাম চন্দ্রনাথ পাহাড়ের রূপ লাবণ্য উপভোগ করতে। সেমিস্টার পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই কাঙ্ক্ষিত চন্দ্রনাথ স্বর্গীয় সৌন্দর্য অবলোকন করে উত্সুক মনের বাসনা পূর্ণ করলাম।

কুমিল্লা থেকে একদিনের ট্যুর, তাই ভোর ৬টার আগেই ৪ জন জড়ো হলাম প্রিন্স সৌদিয়ার বাস কাউন্টারে। বাসে ওঠার পর থেকেই পাহাড় জয়ের অদম্য ইচ্ছায় বিভোর হয়ে রইলাম সবাই। সকালের বাতাস গায়ে মেখে সীতাকুণ্ডু যখন পৌঁছাই ঘড়িতে তখন ৯টা ২০ মিনিট। বাজারে নেমে একটা রেস্তোরাঁয় হালকা কিছু খেয়ে নিলাম। ব্যাগ হালকা রাখতে হবে, কিন্তু পাহাড়ের চূড়ায় সবকিছুর দামও খুব চড়া।

সীতাকুণ্ডু বাজার থেকে সিএনজি করে ২ কিলোমিটার দূরত্বে পাহাড়ের পাদদেশে। সেখানে পৌঁছে প্রত্যেকে ১টি করে বাঁশ নিয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত হলাম হাজার ফুটের পথ পাড়ি দিতে। যাত্রা শুরুর পর যতই ওপরের দিকে উঠছি ততোই যেন মুগ্ধ হচ্ছি।

 

 

 

প্রথমদিকে তেমন কষ্ট না হলেও ৩শ’ ফুট থেকে আপনাকে উঠতে হবে খাঁড়া পাহাড় বেয়ে। কখনো বা চলতে হবে একপাশে পাহাড়ের গা ঘেঁষে আর অন্যপাশে খাদ নিয়ে। একবার পা ফসকে গেলেই পড়তে হবে ২৫০-৩০০ ফুট নিচে। দুই তৃতীয়াংশ ওঠার পর প্রায় সবাই হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম। দুই একজন বলেও বসেছে আর যাওয়া লাগবে না। একজন রীতিমতো ক্লান্ত হয়ে বসে গেছে মাঝপথেই। মাথায় পানি দিয়ে বলছিলাম একটু বিশ্রাম নিতে, তারপর ভালো লাগলে ওপরে উঠবো, না হয় ফিরে যাবো। কিছুক্ষণ পর বান্ধবী কিছুটা সুস্থ হলে বললো চূড়ায় না উঠে ফিরছি না। আমরাও স্বীয় শক্তিতে এগুতে থাকলাম সেই অমায়িক রূপ লাবণ্য দেখার আশায়।

প্রায় দেড়ঘণ্টা পর আমরা পৌঁছালাম প্রথম পাহাড়ের চূড়ায় বিরূপাক্ষ মন্দিরে। এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে রওনা হলাম চন্দ্রনাথ পাহাড়ের দিকে। চূড়াতেই চন্দ্রনাথ মন্দির। সেখানে পৌঁছে রীতিমতো হৈ-হুল্লোড় শুরু করলাম আমরা। চারপাশে তাকিয়েই যেন স্তব্ধ হয়ে গেছি! একদিকে সমুদ্র আর অন্যদিকে পাহাড়ের নির্জনতা। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম উঁচু-নিচু পাহাড়ের সবুজ গাছ-গাছালির দিকে।

প্রকৃতির এই রূপ দেখে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম সবাই। যদিও চোখে দেখা এই সৌন্দর্য মুঠোফোনে আবদ্ধ করা যায় না, তবু এমন নয়নাভিরাম দৃশ্যপট যেন গ্যালারিতে না রাখলেই নয়! পাহাড় থেকে নিচে নামার সময়ও মুগ্ধ হলাম। এই পাহাড়ের রাস্তা দুটি। পাহাড়ে ওঠার সময় বিরূপাক্ষ মন্দির হয়ে ওঠা বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ চন্দ্রনাথ মন্দির থেকে নামার রাস্তার সিঁড়ির ধাপগুলো বড় বড়। তবে পাহাড় থেকে নিচে নামা একদম সহজ। যদিও হাইটফোবিয়া থাকায় ভয়ে আমার দম আটকে আসছিল বারবার তবুও এই যে ভয় ভয় অ্যাডভেঞ্চার এটাও নেহায়েত কম সুখের নয়!

পাহাড় থেকে নেমে আমরা একটা হোটেলে পৌঁছাই। এরপর পেটপুড়ে খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। কারণ শরীরের তখন কাহিল অবস্থা। তারপর সিএনজি করে শহরের আশেপাশের কিছু মনোরম জায়গায় ঘুরে-ফিরে সতেজ হয়ে উঠলাম বিকেলের বাতাসে। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের জন্য এটাকে একদিনের আদর্শ ট্যুরও বলা যেতে পারে।

 

শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়