পাকশীতে এক বোহেমিয়ান দুপুর

মাস দুয়েক আগের কথা। খুলনা যাওয়ার পথে যখন আমাদের ট্রেন এসে পৌঁছালো পাকশী রেলওয়ে স্টেশনে, আমার ঘুম ঘুম চোখ যেন হঠাত্ করেই চমকে উঠল! অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায় ডুবে ছিল পুরো স্টেশন। জানালা দিয়ে দূরে তাকিয়ে দেখি রেললাইনের দু-পাশ বেশ ঢালু হয়ে মিলেছে পিচঢালা রাস্তায়। রাস্তায় এপাশের অংশ শুধু সবুজ আর সবুজ। আর ওপাশে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে কাজ চলছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রের। প্রকৃতি ও যান্ত্রিকতার এ রকম সহাবস্থান এর আগে অনেকবার দেখলেও তাতে প্রশান্তির চেয়ে বিরক্তির পাল্লাটাই ছিল অধিক ভারি। কিন্তু আমার এবারের অনুভূতিটা একেবারেই বিপরীত। প্রকৃতির সবুজ আবরণের সান্নিধ্যে থেকেও যে যান্ত্রিকতার রূপ এতটা সুন্দর হয়ে ফুটে উঠতে পারে তা হয়তো পাকশী না এলে জানতে পারতাম না।

ইচ্ছে ছিল ট্রেনে যাওয়ার। কিন্তু স্টেশনে গিয়ে দেখি সকালে রাজশাহী থেকে পাকশীর কোনো ট্রেন নেই। তাই বাসে করেই রওনা দিতে হলো। গন্তব্য রূপপুর, পাবনা। প্রায় দু-ঘণ্টা পর বাস আমাদের নামিয়ে দিলো গন্তব্যে। বাস থেকে নেমে চারপাশে তাকাতেই মনে হল যেন অন্য এক জগতে এসে পৌঁছালাম। রাস্তার পাশেই কাজ চলছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রের। অসংখ্য শ্রমিক কাজ করছেন সেখানে। তাদের সাইকেল সারি সারি করে রাখা দেয়ালের এপারে। অনবরত চলছে মাঝারি ও বড় আকারের ট্রাকের যাতায়াত। কয়েক পা পরপরই চোখে পড়ছে বিদেশিদের। সম্ভবত তারা পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িত। পুরো শহরজুড়ে যেন বিরাজ করছে এক ধরনের ব্যস্ততা।

রূপপুরের একটি হোটেলে সকালের নাস্তা সেরে আমরা রওনা দিলাম পাকশীর উদ্দেশ্যে। রূপপুর থেকে পাকশী অটোতে করে পাঁচ-দশ মিনিটের পথ, কিন্তু আমরা রওনা দিলাম পায়ে হেঁটেই। হাঁটছি আর একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে তাকাচ্ছি হাতের বামদিকে। আমাদের কয়েক হাত দূরত্বেই পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রের উঁচু দেওয়াল। দেওয়ালের ওপারেই নির্মিত হচ্ছে নতুনমাত্রার এক বাংলাদেশ। পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় প্রতিটি গেটসহ চারপাশে দায়িত্বরত আছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য। তাই ভুলেও ছবি কিংবা সেলফি তোলা যাবেন না। তাহলে চোখের পলকেই আপনার ফোন চলে যাবে তাদের পকেটে।

প্রায় ১০ মিনিট হাঁটার পর রাস্তাটি দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। সোজা পথ ধরে এগুলে লালন শাহ সেতু। আর ডানদিকের পথটি ধরে খানিকটা এগুলে চোখে পড়ে পাকশী রেলওয়ে স্টেশন। লালন শাহ সেতুতে পথচারী প্রবেশের কোনো অনুমতি নেই। তাই কাছ থেকে এই সেতুটি দেখতে চাইলে আপনাকে রূপপুর থেকে অটো কিংবা সিএনজিতে করে আসতে হবে। যেহেতু আমরা পায়ে হেঁটে এসেছিলাম তাই লালন শাহ সেতুতে যেতে পারিনি। তবে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই সড়ক সেতুটি নিয়ে কিছু না বললে আমার এই লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

যাত্রাপথে হঠাত্ করে ঘুম থেকে উঠে কিংবা দূর থেকে তাকালে লালন শাহ সেতুকে অনেকেই বঙ্গবন্ধু সেতু ভেবে ভুল করে বসেন। ভুল করারই কথা। এই সেতুটি দেখতে অনেকটা বঙ্গবন্ধু সেতুর মতোই। ১৮শ’ শতকের আধ্যাত্মিক সাধক লালনের নামে এই সেতুটির নামকরণ করা হয় লালন শাহ সেতু। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে এই সেতুটি।

আমরা সবাই এগিয়ে চললাম ডানদিকের পিচঢালা রাস্তা বরাবর। পাকশী স্টেশন সমতল ভূমি থেকে বেশ খানিকটা উঁচু হওয়ায় একটা কাঁচা রাস্তা দিয়ে সরাসরি উঠে গেলাম ঢালের মাথায়। অবশেষে আমাদের পা পড়ল পাকশী রেলওয়ে স্টেশনে! স্টেশন থেকে খানিকটা দূরে তাকালেই চোখে পড়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র। ওপর থেকে বেশ ভালোভাবেই বিদ্যুত্ কেন্দ্রের ভেতরটা দেখা যায়। মাঝারি ও বড় আকারের অসংখ্য যন্ত্রে গিজগিজ করছে ভেতরটা, সেখানে কাজ করছেন অসংখ্য শ্রমিক? স্টেশনে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা এগুতে থাকলাম হার্ডিঞ্জ ব্রিজের দিকে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে যেতেই একরাশ বিস্ময়ে চোখ জুড়িয়ে গেল। কী চমত্কার একটা ব্রিজ!

শুধুমাত্র অপরূপ সৌন্দর্য নয়, এই ব্রিজ ধারণ করে আছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও নানা স্মৃতি। ব্রিজটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ১৯০৮ সালে। কাজ শেষ হয় ১৯১২ সালে এবং ১৯১৫ সালের ০৪ মার্চ তত্কালীন ভাইসরয় লর্ড ব্যারন হার্ডিঞ্জ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিজটির উদ্বোধন করেন। তার নামানুসারেই ব্রিজটির নামকরণ করা হয় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। ৩৫০ ফুট ব্যাস ও ১৫টি স্প্যান বিশিষ্ট এই ব্রিজটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৩৫০ কোটি টাকা।

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর যখন বাংলার আকাশে বিজয়ের পতাকা উড়তে শুরু করেছে ঠিক তখনই যুদ্ধবিমান থেকে ব্রিজের ওপর চালানো হয় বোমা হামলা। ভেঙে পড়ে এর ১২ নম্বর স্প্যান। এছাড়াও ১৫ ও ৯ নম্বর স্প্যানের নিচের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। লোহার তৈরি প্রায় ২ মণ ওজনের বোমার খোলসটি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ের সামনে। দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য দর্শনার্থী আসেন এই ব্রিজ ও বোমার খোলসটি দেখতে।

এখানে ভ্রমণপ্রিয় মানুষদের ছোট্ট একটা তথ্য দিয়ে রাখি। হার্ডিঞ্জ ব্রিজে ছবি তোলার কোনো অনুমতি নেই। একটা সাইনবোর্ডে সুন্দর করে লেখা ‘ছবি তোলা নিষেধ’। ব্রিজের নিরাপত্তারক্ষীও সাইনবোর্ডের এই লেখার প্রতি বেশ সচেতন। অনেক দর্শনার্থীই তাকে অনুরোধ করছেন কয়েক মিনিটের জন্য ব্রিজের কাছে গিয়ে ছবি তোলার জন্য। কিন্তু কারো অনুরোধই নিরাপত্তারক্ষীর মন গলাতে পারছে না। তবে যারা সিসি ক্যামেরার চোখ ফাঁকি দিয়ে রক্ষীর হাতে ‘চা-নাস্তা’ খাওয়ার জন্য টাকা গুঁজে দিচ্ছেন, রক্ষী তাদের কিছু সময় দিচ্ছেন ব্রিজের কাছে গিয়ে ছবি তোলার জন্য।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দেখে সেখান থেকে অটোতে করে আমরা গেলাম পাকশী রিসোর্ট। জায়গাটা খুব বেশি বড় না হলেও নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাটানোর জন্য বেশ ভালো। পাকশী রিসোর্টে প্রায় ১ ঘণ্টার মতো অবস্থান করে আমরা আবার ফিরে গেলাম রূপপুর। দুপুরের খাবার সেরে রওনা দিলাম ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশনের দিকে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই  জংশন দেখে আমরা রওনা দিই দাশুড়িয়ার উদ্দেশ্যে।

দাশুড়িয়া এসে বাসের টিকেট কাটার পর মনে হলো কী যেন একটা মিস করে ফেলেছি। কিন্তু কী? প্রশ্নটি ক্রমাগত মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো। উত্তর মিললো পাশেই একটি মিষ্টির দোকানে চোখ পড়ায়। মিস করে ফেলেছিলাম পাবনার বিখ্যাত ইলিশ পেটি। অনেকেই হয়তো ভ্রু কুঁচকে ভাবছেন, মিষ্টির দোকানে আবার মাছ কেন? এই ইলিশ পেটি কোনো মাছ নয়, মাছের পেটির আকৃতিবিশিষ্ট এক ধরনের মিষ্টি। বাস আসার আগেই সবাই ঝটপট ঢুকে পড়লাম মিষ্টির দোকানে। ইলিশ পেটি খেতে খেতে একে অপরের দিকে তাকিয়ে বললাম, পাবনা এলাম অথচ ইলিশ পেটি না খেয়েই ফিরবো, তা কী কখনো হয়?