প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত!

/ সাদিকুল নিয়োগী পন্নী

 

আফজাল স্যার খুব কর্মঠ, দক্ষ ও সত্ অফিসার। কাজের গতিশীলতা আর স্বচ্ছতার জন্য তিনি তার রুম সবার জন্য উন্মুক্ত রেখেছেন। ফলে তার রুমে যে কেউ যেতে পারেন বিনা অনুমতিতে। এই সুযোগে অনেকেই অকারণে আফজাল স্যারের রুমে গিয়ে বসে থাকেন। সেদিন অফিসের রাব্বি নামে এক কর্মচারী আফজাল স্যারের রুমে গেলেন। আফজাল স্যার তখন গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দেখছিলেন। রাব্বিকে দেখে তিনি ফাইল থেকে চোখ সরিয়ে বললেন, ‘কিছু বলতে চান?’

—জি স্যার, আমার বিরাট সমস্যা?

—ঘটনা কী বলুন, দেখি কিছু করতে পারি কি না।

—স্যার, আমার নাক দিয়ে গরম বাতাস বের হয়।

এই বলে রাব্বি তার মাথাটা এগিয়ে নিয়ে নাক দিয়ে জোরে বাতাস ছাড়লেন। সর্দির কারণে কিছু তরল পদার্থ আফজাল স্যারের ফাইলের ওপর ছিটকে পড়ল।

—এই আপনি করছেনটা কী? সোফায় গিয়ে বসুন।

রাব্বি সোফায় বসতে বসতে বললেন, ‘স্যার, আমার ছুটি প্রয়োজন। ভালো হয়ে আবার কাজে যোগদান করব।’ 

আফজাল স্যার বললেন, ‘ছুটি নাহয় দিলাম। কিন্তু এমন সমস্যা তো আমি জীবনে শুনিনি।’ —ডাক্তার দেখিয়েছেন?

—জি না স্যার। তবে পরিচিত এক ফার্মেসির লোকের সাথে কথা বলেছি।

—তিনি কী বলেছেন?

—বলেছেন বিশ্রাম নিতে। আর নাকে নিয়মিত ঠান্ডা পানি ঢালতে। তাহলেই গরম বাতাস ঠান্ডা হয়ে যাবে।

—ছুটি নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আপনি বসুন। আমার এখানে একটু পর একজন ডাক্তার আসবেন। দেখি, উনি কী বলেন?

কিছুক্ষণ পর ডাক্তার মিশুক এলেন আফজাল স্যারের রুমে। আফজাল স্যার তাকে দেখেই বললেন, ‘আপনার জন্য আজ এক বিচিত্র রোগীর ব্যবস্থা করেছি।’

মিশুক হেসে বললেন, ‘কোথায় রোগী?’

আফজাল চোখের ইশারায় দেখালেন রাব্বিকে।

মিশুক তার কাছে বসে বললেন, ‘আপনার কী সমস্যা?’

—স্যার, আমার নাক দিয়ে গরম বাতাস বের হয়।

মিশুক প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন, ‘কই, আমার কাছে তো মনে হচ্ছে আপনার কিছুই হয়নি।’

—আমি তো আর মিথ্যা বলছি না। এই রুমের এসির বাতাসের কারণে হয়তো বুঝতে পারছেন না।

মিশুক মুচকি হেসে আফজাল স্যারে কাছে গিয়ে কী যেন কানে কানে বললেন।

তারপর রাব্বিকে সোফায় শোয়ালেন।

মিশুক ব্যাগ থেকে বড়ো সাইজের সুচ সংবলিত একটা সিরিঞ্জ বের করে বললেন, ‘এটা দিয়ে আপনার নাকের ভিতর থেকে গরম বাতাস বের করে আনব। আপনি নড়াচড়া করবেন না।’

এই কথা শুনে রাব্বি এক লাফে সোফা থেকে উঠে কান্না করতে করতে বললেন, ‘স্যার, আমার কিছু হয়নি। ছুটির জন্য মিথ্যা কথা বলেছিলাম।’

আফজাল স্যার রেগে রাব্বিকে রুম থেকে বের করে দিলেন।

 

দুই.

দিন দিন আফজাল স্যারের রুমে অপ্রয়োজনীয় লোকজনের আনাগোনা বেড়েই চলছে। একদিন বিরক্ত হয়ে তিনি তার ব্যক্তিগত সহকারী আকরাম এবং দুই অফিস সহকারী নান্টু ও পিন্টুকে কড়া নির্দেশনা দিলেন, ‘এখন থেকে অনুমতি ছাড়া কেউ যেন আমার রুমে ঢুকতে না পারে।’

এই আদেশ জারির ফলে ফেঁসে গেলেন অফিসে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী। বিশেষ করে যারা প্রয়োজনে স্যারের কাছে আসেন, তাদের হলো বিড়ম্বনা। সেদিন রিংকু নামে এক অফিসার সরাসরি স্যারের রুমে ঢুকতে গিয়ে নান্টু আর পিন্টুর সঙ্গে রীতিমতো কুস্তি খেলে এলেন। রিংকু দুজনের সঙ্গে পরাস্ত হয়ে ফিরে এলেন স্যারের সঙ্গে দেখা না করেই। পরে তিনি বিষয়টা তার সহকর্মী গৌতমকে জানালেন। পরদিন দুজন যুক্তি করে হাত-পায়ে এবং প্রয়োজনীয় সব জায়গায় তেল মেখে আফজাল স্যারের রুমের সামনে উপস্থিত হলেন। বরাবরের মতো নান্টু আর পিন্টু তাদের জাপটে ধরল। কিন্তু তেলের সঙ্গে তারা পেরে উঠতে পারল না। রিংকু আর গৌতমকে দেখে স্যার রীতিমতো হতবাক।

আফজাল স্যার চিত্কার শুরু করলেন। ছুটে আসল নান্টু আর পিন্টু। স্যার রাগান্বিত হয়ে বললেন, ‘এরা এলো কীভাবে?’

নান্টু ও পিন্টুি বলল, ‘স্যার উনারা শরীরে তেল মেখে এসেছেন। পিছলে চলে এসেছেন।’

আফজাল স্যার রিংকু এবং গৌতমকে বললেন, ‘আপনারা কেন এসেছেন?’

স্যার, আপনার নিরাপত্তার বলয় পার হওয়া যায় কি না তা পরীক্ষা করতে এসেছিলাম। এখন তাহলে যাই—এই বলে চলে এলেন রিংকু ও গৌতম।

 

তিন.

এই ঘটনার শুনে অফিসের আরেক কর্মকর্তা কবি মোস্তাফিজ বেশ উচ্ছ্বসিত। তিনি রিংকু ও গৌতমকে বললেন, ‘স্যারকে কোনোদিন কবিতা শোনাতে পারিনি। তিনি আমাকে পাত্তাই দেন না। গতরাতে যে কবিতাটি লিখেছি আজ তা শোনাতে চাই। আপনারা তেলের ব্যবস্থা করেন।

রিংকু নারিকেল তেলের বোতল কবি মোস্তাফিজের হাতে তুলে দিলেন।’

মোস্তাফিজ সারা শরীরে তেল মাখতে মাখতে বললেন, ‘আজ কবিতা না শুনে পালাবেন কোথায় স্যার? হা হা হা...’

কবি মোস্তাফিজ আফজাল স্যারের রুমের ঢুকতে গেলে নান্টু আর পিন্টু তার গতিরোধ করলেন।

মোস্তাফিজ বললেন, ‘সরে দাঁড়াও। আমি তেল মেখে এসেছি।’

নান্টু ও পিন্টু পকেট থেকে ছাইয়ের প্যাকেট বের করে বলল, ‘আমরাও ছাই নিয়ে এসেছি।’

কবি মোস্তাফিজ তারপরও বাধা অতিক্রম করতে চাইলেন। কিন্তু নান্টু ও পিন্টু তাকে ছাই দিয়ে আঁকড়ে ধরল। মোস্তাফিজ ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলেন। আর তেলের সঙ্গে ছাই তার সারা শরীরে লেপ্টে গিয়েছে।

তিনি রুমে ফিরে আসার পর সবাই হাসাহাসি শুরু করলেন। কেউ কেউ বললেন, ছাই মাখানো কবি মোস্তাফিজ।

 

চার.

অফিসে এই ঘটনা রটে যাওয়ার পর আর কেউ অনুমতি ছাড়া আফজাল স্যারের রুমে যাওয়ার সাহস পান না। কিছুদিন পর এই সমস্যা সমাধানের জন্য আশিক নামে এক তরুণ অফিসার এগিয়ে এলেন। তিনি একদিন রেইনকোটে পরে অফিসে এলেন। তারপর রেইনকোটে পোড়া মবিল মেখে আফজাল স্যারে রুমের সামনে উপস্থিত হলেন। নান্টু আর পিন্টু অতন্দ্র প্রহরীর মতো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রেইনকোট থেকে টপটপ করে ফোঁটা ফোঁটা মবিল পড়ছে। এই পরিস্থিতি দেখে নান্টু আর পিন্টু পথ ছেড়ে দাঁড়াল। আশিক বিনা বাধায় আফজাল স্যারের রুমে ঢুকে গেলেন।

স্যার কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, ‘কী ব্যাপার আপনাকে কেউ বাধা দেয়নি?’

আশিক স্যারের কথায় কান না দিয়ে বললেন, ‘আমি একটা পুরস্কার পেয়েছি, স্যার। তাই ভাবলাম আপনার সাথে কোলাকুলি করব।’ এই বলে আশিক আফজাল স্যারকে জড়িয়ে ধরলেন।

আফজাল স্যার বুঝে ওঠার আগেই তার সারা শরীর পোড়া মবিলে মাখামাখি।

স্যার চিত্কার করে বললেন, ‘করেছেনটা কী? আমার এই সাদা শার্ট। আমেরিকা থেকে আনা হয়েছে। আপনি লাখ টাকার শার্ট নষ্ট করে দিলেন। হায় হায়! এ কী হলো!’

এই ঘটনার পর থেকে আফজাল সাহেব আরো সতর্ক হয়ে গেলেন। তিনি অফিস করেন রেইন কোট পরে। আর রুমে অনুমতি সাপেক্ষে সবাইকে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছেন। তবে তার আগে কারো গায়ে তেল বা মবিল মাখানো কি না সেটা নিশ্চত করার জন্য পেট্রোল পাম্পের দুই জনকে নিয়োগ দিয়েছেন।    g