/ শফিক হাসান
প্রিয়বরেষু,
শুভেচ্ছা নিন। দেশের এখন কে আর কাকে চিঠি লেখে? এমনকি বেয়ারিং চিঠি লেখার দিকেও মানুষের ঝোঁক নেই!
আপনাদের কীর্তিকলাপ দেখতে দেখতে মন চাইল একটি চিঠি লিখি। কিন্তু সেই চিঠি যাবে কোন ঠিকানায়? আপনারা যে কখন কোথায় থাকেন, কোন সুন্দরীর অন্বেষায় সময়ক্ষেপণ করেন, জানি না! চিঠি পৌঁছানোর সঠিক ঠিকানা না থাকায় অবশেষে খোলা চিঠির আশ্রয় নিতে হলো।
আপনারা নিশ্চয়ই এখন সুসময় অতিবাহিত করছেন, মানুষের হাতে সৌন্দর্যবর্ধক বটিকা তুলে দিতে পেরে! বাংলাদেশের রূপচর্চায় আপনারা অল্পদিনেই বিশাল ভূমিকা রেখেছেন—সন্দেহ নেই। মানুষ সুন্দরের পূজারী। আপনারাও হয়তো সুন্দরের পূজা করার মানসিকতা থেকেই গড়ে তুলেছেন এই সৌন্দর্যবর্ধক প্রতিষ্ঠান। হয়তো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন—দেশের সব মানুষকে সুন্দর ও সুন্দরী বানিয়েই ছাড়বেন। বেয়াড়া ও অতি উত্সাহী কেউ কেউ মাঝে মাঝে আবিষ্কার করে ফেলে, আপনাদের চরিত্র ও মুখে নাকি ছোপ ছোপ কালো দাগ আছে!
আর কেউ না জানুক, আমি বিশ্বাস করি—এটা হতেই পারে না। যিনি নিজে ‘দাগযুক্ত’, তিনি কীভাবে অন্যকে দাগমুক্ত করার সাহস করবেন! আপনাদের কারো কারো এক বা একাধিক মেয়েও আছে। তারা কি অসম্ভব রকমের... থাক, ব্যক্তিগত কথা বলার দরকার কী! কবি বলেছেন—কালো আর ধলো বাইরে কেবল/ ভিতরে সবার সমান রাঙা!
আপনাদের আবিষ্কৃত এই ধন্বন্তরী ‘মলম’-এ সুন্দরীরা আরো সুন্দরী হয়েছে কেবল—কালোরা সুন্দরী হয়নি। যদি তাই হতো, গ্রামগঞ্জে কালো বলে যেসব মেয়ের বিয়ে থমকে আছে, তাদের বিয়ে হয়ে যেত আরো আগেই। বিয়ে হয়ে গেলে এদের দোয়ার গুণেই আপনারা আরো বড় কোম্পানির মালিক হতেন! বলাবাহুল্য, কেন যে আপনারা শুধু ত্বক ফর্সাকেই সুন্দরের মাপকাঠি ভাবেন—আগে বুঝিনি, এখনো বুঝি না!
ছাগল প্রাণীটা দিন দিন মন্ত্রী ও ক্ষমতাবানদের সম্পত্তি হয়ে যাচ্ছে। ঐ শব্দ পারতপক্ষে উচ্চারণ করতে চাই না। এখন না করেও পারছি না। শুনতে পাই, কালো ছাগলের চেয়ে সাদা ছাগলের মূল্য নাকি বেশি। তবে কেন লোকজন আপনাদের এ ক্রিম ব্যবহার করে কালো ছাগলের লোমকে সাদা করে দিল না? তাদের কি টাকা-পয়সার প্রতি কোনোরূপ মায়া-দয়া নেই!
দেশে কালো কাক লাখ লাখ, কিন্তু সাদা কাক বিরল। আপনাদের জাদুর কাঠির মলম দ্বারা কি পারতেন না অন্তত একটা কালো কাককে সাদা করতে? এ ছাগল এবং কাককে দিয়ে বিজ্ঞাপন করানো যেত—সাদা সাদা আরো সাদা/ থাকবে না কোনো কালা!
তবে কি এই জাদুর মলম তাদের কাছে পৌঁছায়নি? কিন্তু কেন গণমানুষ এই মহা আবিষ্কারের কথা জানবে না? সারি সারি মডেল নিয়ে তো আপনারা আর নীরবে প্রচারণা চালাননি। দিনের পর দিন টেলিভিশনের পর্দায়, পত্রিকার পাতায় সুন্দরী মডেলকন্যা, হার্টথ্রব (!) পুরুষ মডেল এ পণ্যের গুণগান করেছে। তাদের ভক্তদের কাছে কেন এই খবরটা পৌঁছাবে না—ক্রিম মাখলে চেহারা সুন্দর হয়? বিশেষ করে মুখ? (ভেতরটা থাকলই না হয় সদরঘাট, উপরে ফিটফাট হলেই হলো!)
আমরা জানি না, আপনারা চরিত্র সুন্দর করার জন্য ক্রিম আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়েছেন কিনা। যদি সেটা পারতেন, মনে হয়—ওটাই হতো সবচেয়ে বড় কাজ। সুন্দর চেহারার চেয়ে সুন্দর চরিত্র নিশ্চয়ই অনেক বেশি কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু কলিযুগে কে উচ্চারণ করবে সে সত্যবচন!
যাক, সে কথা। দুর্মুখেরা আপনাদের বদনাম করতে যেমন ছাড়ছে না, পণ্যের মডেলদের নীতি-নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। তারা নাকি জনগণের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করছে। টাকার লোভে যেনতেন পণ্যের বিজ্ঞাপনের মডেল হয়ে ভক্তদের সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভক্তরা এদের দ্বারা খুব সহজেই প্রভাবিত হয়। মডেলরা নাকি সহজেই টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যায়। এদের বিচার-বিবেচনাবোধ শূন্যের কোঠায়। টাকার কাছে তারা নতজানু তো হবেই, এটা কি স্বাভাবিক নয়?
আরো সর্বনেশে কথা শোনা যাচ্ছে জনপ্রিয় মডেলদের সম্বন্ধে। খারাপ পণ্য বাজারজাতকারীকে যেমন প্যাঁদানি দেওয়া হয়, তেমনি এদেরও আইনের আওতায় আনা উচিত বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এমন অসামাজিক কথা বলছেন কেউ কেউ! কেউ কেউ এমনটাও বলছেন—সংশ্লিষ্টদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক, কেন তারা বাজে পণ্যের মডেল হতে গেল!
এদেশে এমন মডেল কি খুঁজে পাওয়া যাবে, যারা জনস্বার্থ বিবেচনা করে পণ্যের গুণগত মান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তবেই গুণগান করেন? থাক, ওসব বালখিল্য আলাপ। বিএসটিআই যে কাজ করবে, সে কাজ মডেল করবে কেন—তাদের কী দায়! তারা কি সরকার থেকে বেতন-ভাতা পায়? গায়ের রং ‘দুধে আলতা’ না বলে এখন বোধহয় ‘অ্যান্টিবায়োটিকে আলতা’ বলার সময় হয়েছে!
আর বিশেষ কী লিখব। মূল্যবান সময় নষ্ট করব না আর! আপনাদের সন্তান থাকুক দুধে-ভাতে, স্নো পাউডারের সুখে!
ইতি
ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম ব্যবহার না করা জনৈক নাগরিক