পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (পিএসটিসি) ও দৈনিক ইত্তেফাক আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠক
সহযোগিতায় : রাজকীয় নেদারল্যান্ডস দূতাবাস ও জাতীয় এইডস/এসটিডি প্রোগ্রাম
শনিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০১৯; মজিদা বেগম মিলনায়তন, ইত্তেফাক ভবন, কাওরান বাজার, ঢাকা।
বিষয় : ‘বাংলাদেশে এইচআইভি ঝুঁকিতে তরুণ জনগোষ্ঠী— প্রতিরোধে করণীয়’
প্রধান অতিথি : অধ্যাপক ডা. মো. শামিউল ইসলাম,
পরিচালক, এমবিডিসি ও লাইন ডাইরেক্টর, টিবি-লেপ্রোসি ও এএসপি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
সঞ্চালক : ড. নূর মোহাম্মদ, নির্বাহী পরিচালক, পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (পিএসটিসি)।
মূল প্রবন্ধ : ডা. মো. মাহবুবুল আলম, হেড অব প্রোগ্রামস, পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (পিএসটিসি)।
সভাপতি : আবুল খায়ের, প্রধান প্রতিবেদক, দৈনিক ইত্তেফাক।
অধ্যাপক ডা. মো. শামিউল ইসলাম
পরিচালক, এমবিডিসি ও লাইন ডাইরেক্টর,
টিবি-লেপ্রোসি ও এএসপি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর,
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়
জাতিকে এইডসমুক্ত করতে বাংলাদেশ সরকার ব্যাপক আকারে কাজ শুরু করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ প্রতিহত করার ক্ষেত্রে বিনামূল্যে কনডম বিতরণসহ কনডম ব্যবহারে আগ্রহী করে তুলতে নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। কনডম ব্যবহার নিশ্চিত করতে উন্নত দেশে আইন রয়েছে। আমাদেরও এমন ব্যবস্থা গ্রহণ খুব প্রয়োজন। এইডস একটা রোগ—এ নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারো এইডস হলে তাকে ঘৃণা করার মানসিকতাও আমাদের দূর করতে হবে। কেননা, পৃথিবীতে এইডস হওয়ার প্রধানতম কারণ শুধু অনিরাপদ যৌনতা নয়, বরং অনিরাপদ রক্ত গ্রহণ, একই সিরিঞ্জে মাদক গ্রহণে এইডসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। পরিবারের নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক বিধিনিষেধ মেনে উন্নত জীবনব্যবস্থা নিশ্চিত করা, তরুণদের জন্য সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে এইডসের ঝুঁকি থেকে তাদের দূরে রাখা সম্ভব হবে। এইডস ডায়াবেটিসের মতোই একটা রোগ—যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। এইডসের ওষুধ খেলে সেই মানুষটি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। তার জীবনে কোনো অস্বাভাবিকতা থাকবে না। তাই এইডস হলে ভয়ের কিছু নেই। শুধু নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। এইডসের এই চিকিত্সাও একেবারেই ব্যয়বহুল নয়।
ডা. মো. মাহবুবুল আলম
হেড অব প্রোগ্রাম, পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড
ট্রেনিং সেন্টার (পিএসটিসি)
মূল প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ: ২০১৯ সালে ৯১৯ এইডসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে এইডস রোগীর সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। সে লক্ষ্য অর্জনে তরুণদের এইডস সচেতনতা বাড়াতে দেশব্যাপী প্রতিরোধ কর্মসূচি গ্রহণ, মা থেকে শিশুতে সংক্রমণ ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং এইচআইভি সম্পর্কে শিক্ষা মূলধারায় অন্তর্ভুক্তি, গবেষণা ও বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রদান করতে হবে। তিনি বলেন, তরুণদের বিপথে যাওয়ার প্রবণতা বেশি, বেশি মাদক গ্রহণের হার। প্রতিনিয়ত তরুণরা গ্রাম থেকে শহরে আসে কিংবা দেশ থেকে বিদেশে পরিভ্রমণ করে থাকে। ইত্যাদি কারণে তরুণদের মধ্যে এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা বেশি থাকে। তাই এইডস নির্মূলে তরুণদের দিকেই বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
ড. নূর মোহাম্মদ
নির্বাহী পরিচালক, পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড
ট্রেনিং সেন্টার (পিএসটিসি)
বাংলাদেশে যদিও এইডস রোগী ও এইডস সংক্রমণের হার এখনো কম, তথাপি আমাদের জনগোষ্ঠীতে ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেশি। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ ঝুঁকির মাত্রা যথেষ্ট। তাই কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের এইডসের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানাতে হবে ও বোঝাতে হবে। পিএসটিসি নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহায়তায় ’সংযোগ’ প্রকল্পের মাধ্যমে চারটি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী; যেমন: পরিবহন শ্রমিক, তরুণ কর্মজীবী, ভাসমান নারী যৌনকর্মী এবং যারা রাস্তা, ফুটপাত বা ছোটোখাটো বস্তিতে থাকে তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ও প্রয়োজনে সেবা প্রাপ্তির সুবিধার্থে রেফারেল লিংক গড়ে তুলেছে, যাতে করে তারা সেবা পায়।
হারুন অর রশীদ
প্রধান নির্বাহী, লাইট হাউজ
তরুণ জনগোষ্ঠী এখন অ্যান্ড্রয়েড আর অ্যাপল ভাগে বিভক্ত। তাই আমাদের সেই ভাষায় কথা বলতে হবে। তরুণ, কিশোরদের সচেতনতা বাড়াতে তাই অ্যাপকেন্দ্রিক প্রচারণা করা যেতে পারে। তাছাড়া টিভি, পত্রিকার পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালাতে হবে। অনলাইন স্টাডি সার্কেল করা যেতে পারে। তাহলে হয়তো আমরা সব শ্রেণির কাছে পৌঁছাতে পারব। আমরা তরুণ ও কিশোরদের কাছে পৌঁছাতে পারছি না। কারণ আমাদের স্কুলের শিক্ষকদেরই এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করার মানসিক শক্তি নেই। তারাই লজ্জায় এসব বিষয়ে কথা বলেন না। শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘বাসায় পড়ে নিও’। এতে শিক্ষার্থীদের কাছেও এইডস একটি যৌন রোগ এবং নিষিদ্ধ বিষয় হয়ে দেখা দেয়। সেজন্য শিক্ষকদেরও কাউনসেলিং ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
ডা. মো. জয়নুল হক
প্রোগ্রাম ম্যানেজার, মা ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগ
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর
স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য ঈর্ষণীয়; কিন্তু সেই সাফল্যের মাঝেও আমাদের এখনো কিছু বাধা রয়েছে। এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তরুণদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ নির্মূলে আমাদের বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। তরুণদের সচেতন করতে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ২০১৭ সাল থেকে নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জাতীয় কৈশোর স্বাস্থ্যনীতিতেও কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য উন্নয়নে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
ডা. রাহাত আরা নূর
টেকনিক্যাল অফিসার (এইচআইভি এবং এসটিআই)
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, বাংলাদেশ অফিস
বাংলাদেশে এইডস শনাক্তকরণের পরিধি বাড়ছে। ফলে নানা দিক থেকেই এইডস রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এটা ইতিবাচক দিক। শিক্ষকদের সামাজিক লজ্জা ভেঙে শিক্ষার্থীদের নিঃসংকোচে এইডস সংক্রমণ প্রতিরোধের শিক্ষা ক্লাসে আলোচনা করতে হবে। এইডস নির্মূলে তরুণদের কনডম ব্যবহারে উত্সাহিত করতে হবে। নারী যৌনকর্মী ও গ্রাহকদের কনডম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে এইডস নির্মূল সহজ হবে।
রুহুল মোমিন
উপপরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক
শিক্ষা অধিদপ্তর
জরিপ বলছে, দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি ৩ কোটির বেশি তরুণ রয়েছে, যারা এইচআইভি সংক্রমণের বিষয়ে জানে না। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে যেভাবেই হোক এইডসের ভয়াবহতা এবং এ থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কে জানাতে হবে। তা না হলে এইচআইভি এইডস মারাত্মক হারে ছড়াতে শুরু করবে। এর জন্য আমরা মসজিদের ইমামদের যুক্ত করতে পারি। এটা খুব ইতিবাচক হবে। এই প্রচারে অর্থ বরাদ্দ খুব বড়ো বিষয়। আবার অর্থ বরাদ্দ হলে তা ঠিকমতো খরচ হচ্ছে কি না, তার মনিটরিং জরুরি। এ বিষয়টা খুব জোর দিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রবাসীদের দেশে ঢোকার সময় রক্ত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। ক্যানসারে আক্রান্ত হলে সবাই সহযোগিতা করে, অথচ এইডসে আক্রান্ত হলে মানুষ তাকে ঘৃণা করে। মানুষের এই মানসিকতা দূর করতে না পারলে এইডস নির্মূল করা অসম্ভব। কেননা, কারো এইডস হলেও তারা লুকিয়ে রাখবে, আর অজান্তেই তা ছড়াবে।
কানিজ ফওজিয়া খানম
রিসার্চ অফিসার, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড
স্কুলের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বইতে এইডস ও এইচআইভি বিষয়ে পাঠ্য রয়েছে। তবে শুধু বইয়ে থাকলেই হবে না, সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। তিনিও বলেন, আমাদের স্কুলের শিক্ষকদের এইডস ও এইচআইভি বিষয়ে ক্লাসে আলোচনা করার মানসিকতা নেই। এই মানসিকতার বদল ঘটাতে হবে। আমাদের নিজেদের সংশোধন করতে হবে, বদলাতে হবে আচরণ।
ডা. ইখতিয়ার উদ্দিন খন্দকার
পরিচালক (স্বাস্থ্য), কেয়ার বাংলাদেশ
বয়োসন্ধিকালীন পর্যায়টা শরীরে ও মনে পরিবর্তন ঘটায়। এ কারণে কৈশোরকালীন সেই বয়সে নানা বিষয়ে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। সে যে যৌন সক্ষম মানুষ, সেটা প্রমাণ দিতে বা নিজের কাছে নিশ্চিত হতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। একই ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েই তরুণেরা নিজেদের বড়ো প্রমাণ করতে গিয়ে প্রথমে সিগারেট এবং পরে ধীরে ধীরে মাদকাসক্ত হয়ে ওঠে। তার এই পদক্ষেপগুলো যে ভুল এবং তার জীবন যে ধ্বংস করে দিতে পারে, এ বিষয়টি তাকে বোঝাতে হবে। এটা শাসন করে, স্কুলে পড়িয়ে সম্ভব হবে না। এর জন্য মোটিভেশন ও কাউনসেলিং প্রয়োজন। সে যেন ভালো-খারাপ বুঝতে পারে। সেই সঙ্গে যখন সে খারাপ কাজের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন তা থেকে ফিরে আসার মানসিক শক্তি যাতে তৈরি হয় সেটাও জরুরি। এর জন্য ‘সোশ্যাল কাউনসেলিং’ প্রয়োজন। আমরা স্কুল-কলেজে পড়ুয়াদের কথা বলছি, অথচ একটা বিশাল জনগোষ্ঠী স্কুলের বাইরে আছে, তাদের কথা বলছি না। এদের কাছে কীভাবে পৌঁছাব, সেই চিন্তাও করতে হবে। তার জন্য ভিন্ন পরিকল্পনার প্রয়োজন হবে।
মো. শরীফ হোসেন
তরুণ প্রতিনিধি
তরুণ কর্মী হিসেবে আমি ট্রাকচালকদের জীবনধারা নিয়ে কাজ করেছি। সেখানে দেখেছি, ট্রাকচালকেরা একেবারেই এইডসের বিষয়ে সচেতন নয়। মাদক নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা যেমন সুঁই-সিরিঞ্জ ব্যবহার করে, একইভাবে বিভিন্ন যৌনপল্লিতে গিয়ে কনডম ছাড়া যৌনকাজে লিপ্ত হয়। এই বহুবিধ কারণে এইডস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই একেকটি পেশা বা যে কোনো জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে প্রচারণা চালাতে পারলে সেটা কার্যকর হবে। মানুষের মাঝে এইডস নিয়ে অনেক ভুল ধারণাও রয়েছে। অনেকে মনে করে এক বাথরুম ব্যবহার করলে, এক কাপড় পরলে, এক সঙ্গে খেলাধুলা করলে এইডস ছড়ায়। অনেকে মনে করেন এইডস চিকিত্সা অনেক ব্যয়বহুল। তাই অনেকে এইডস হলেও তা প্রকাশ করে না। এই ভ্রান্তিগুলো দূর করা দরকার।
অধ্যাপক ড. মো. মইনুল ইসলাম
চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন
সায়েন্সেস বিভাগ
এইডস সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে। এই ভুল ধারণা ভাঙতে হবে। আর এই রোগ সম্বন্ধে মানুষের নেতিবাচক ধারণা পালটাতে গণমুখী প্রচারণা চালাতে হবে। বিশেষ করে পুরুষ ও নারী যৌনকর্মী, অভিবাসীদের মধ্যে এ প্রচারণা বেশি করে চালাতে হবে। আমাদের তরুণদের বিশেষ করে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের মধ্যে এইচআইভি সম্পর্কে সমন্বিত জ্ঞান খুব কম। তাদের জানানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তাছাড়া তরুণদের মধ্যে এইচআইভি বিস্তার ও প্রতিরোধ সংক্রান্ত আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট অর্থ বরাদ্দ।
মো. ইরফান হোসেন
প্রোগ্রাম অফিসার, পপুলেশন কাউন্সিল
‘বাংলাদেশে এইচআইভি ঝুঁকিতে তরুণ জনগোষ্ঠী এবং প্রতিরোধে করণীয়’ বিষয়টি অত্যন্ত সময়োপযোগী। অনৈতিক যৌন সম্পর্ক নয়, অসচেতনতা এবং অনিরাপদ ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এইচআইভি বিস্তারের অন্যতম কারণ বিষয়টি সব প্রচারণায় আসা প্রয়োজন। অথচ সমাজে আমাদের মাইন্ডসেট এমন যে শুধু অনৈতিক যৌন সম্পর্ক কারণে এইডস হয় এবং এইডস আক্রান্ত রোগীকে সবাই ঘৃণা করে। সমাজের প্রচলিত এই ভুল ভাঙতে হবে। তা না হলে মানুষ এইডসকে যৌনরোগ মনে করে লুকিয়ে রাখবে। আর তা মানুষের মধ্যে বিস্তৃতি ঘটাবে, যা পরে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে।
আবুল খায়ের
চিফ রিপোর্টার, ইত্তেফাক
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে প্রথম এইডস রোগীর দাফনের সময় তাকে মাটি দেওয়ার মানুষ পাওয়া যায়নি। অনেকেই তাকে পুড়িয়ে ফেলার কথা বলেছিলেন। সেই অবস্থা বিচারে এখন পরিস্থিতি অনেক ইতিবাচক। মানুষ এই রোগের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারছে। তবে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করা সম্ভব হয়নি। আজও অনেকেই এই রোগের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। সেই লক্ষ্য অর্জনে আমাদের তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সুপারিশ
এইডস প্রতিরোধে যুব সমাজের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তারা যদি এইডস সংক্রমণ বিষয়ে সচেতন হয় তাহলে বাংলাদেশ থেকে এই রোগ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব। সে জন্য তরুণদের এইডসের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে এবং এইডস প্রতিরোধে সামগ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সেইসঙ্গে সরকারের গৃহীত নানামুখী কার্যক্রমের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ। মানুষকে সচেতনতার কাজটা শুরু করতে হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ঘর থেকে। তাই মা-বাবা ও অভিভাবকদেরও সচেতন করে তুলতে হবে। এর জন্য সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যবস্থা করতে হবে প্রশিক্ষণ ও প্রচারের। সেইসঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে এবং ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে এইডস রোগকে প্রতিরোধ করতে দেশজুড়ে সামাজিক সচেতনতা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা জরুরি। এইডস সবচেয়ে বেশি ছড়ায় পরীক্ষা ছাড়া রক্ত গ্রহণের মাধ্যমে, সিরিঞ্জে মাদক গ্রহণ, বিদেশ থেকে আসা এইচআইভি আক্রান্ত শ্রমিক ও অভিবাসীদের মাধ্যমে এবং যৌনকর্মীদের কনডম ছাড়া যৌনমিলনের মাধ্যমে। তাই বিদেশ থেকে যারা বাংলাদেশে আসবেন তাদের বাধ্যতামূলক রক্ত পরীক্ষা করা, ঝুঁকিপূর্ণ যৌনমিলনে কনডম ব্যবহার নিশ্চিত করা, হাসপাতাল ও মেডিক্যাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীদের পরীক্ষা কাজে ব্যবহূত যন্ত্রপাতি ঠিকমতো স্টেরিলাইজ করা হচ্ছে কি না তা নজরদারি করার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়।
প্রস্তাবনা
বাংলাদেশে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকলেও প্রতিবছর নতুন আক্রান্তের সংখ্যা এখনো নিম্নমুখী নয়। এর অন্যতম কারণ দেশে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের উপস্থিতি। এইডস আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে একটি বড়ো অংশ হচ্ছে এইচআইভি আক্রান্ত বিদেশ ফেরত শ্রমজীবী। যার কারণে তাদের স্ত্রী-সন্তানরাও আক্রান্ত হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার (৩.৯%) সবচেয়ে বেশি। এছাড়া দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী এবং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এইচআইভি/এইডস সংক্রান্ত পরিপূর্ণ ধারণার ঘাটতি রয়েছে। প্রতিনিয়ত তারা গ্রাম থেকে শহর, দেশ থেকে বিদেশে পরিভ্রমণ করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তরুণরাই এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি বহন করছে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তরুণ এবং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এইচআইভি/এইডস সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি করে তাদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার নিশ্চিত্ করার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণের হার শূন্যে নামিয়ে আনা।