তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরুব্বিদের গুরুত্বপূর্ণ বয়ান ও মুসল্লিদের নফল নামাজ, তাসবিহ তাহলিল, জিকির আসকারের মধ্যদিয়ে গতকাল শনিবার বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় দিন অতিবাহিত হয়েছে। আজ রবিবার পূর্বাহ্নে অর্থাত্ বেলা ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে যেকোনো এক সময় আখেরি মোনাজাতের মধ্যদিয়ে এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শেষ হচ্ছে। কাকরাইল জামে মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিব হাফেজ মাওলানা জুবায়ের আহমেদ মোনাজাত পরিচালনা করবেন বলে জানান ইজতেমা আয়োজক কমিটির মুরুব্বিরা। তাবলিগের ছয় উসূলের (মৌলিক বিষয়ে) ওপর গতকাল বাদ ফজর ভারতের মাওলানা আব্দুর রহমানের বয়ানের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় দিনের বয়ান শুরু হয়। এ বয়ান বাংলায় তরজমা করেন বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল মতিন। বাদ জোহর বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ইসমাইল গোদরা। তার বয়ান ভাষান্তর করেন মাওলানা মো. নূর-উর-রহমান। বাদ আছর বয়ান করেন ভারতের শায়খ মাওলানা জোহায়েরুল হাসান। বাদ মাগরিব বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ইব্রাহীম দেওলা।
বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষ্যে শিল্পনগরী টঙ্গী এখন ধর্মীয় নগরীতে পরিণত হয়েছে। আখেরি মোনাজাতের আগ পর্যন্ত মানুষের এ আগমন ঢল অব্যাহত থাকবে। ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম ধাপে ছয়টি (৮৮, ৮৯, ৯০, ৯১, ৯২ ও ১৫(খ) সংরক্ষিত খিত্তাসহ ৯২টি খিত্তা স্থাপনের পরও ১৪টি নতুন খিত্তা স্থাপন করা হয়েছে। এরপরও মুসল্লি সংখ্যা বেশি হওয়ায় রাস্তার পাশ, অলিগলি, বাসাবাড়ির ছাদ টঙ্গীর শহিদ আহসান উল্লা মাস্টার সরকারি হাসপাতালে প্রতিষ্ঠিত শহিদ মিনার চত্বরে, হাসপাতালের মাঠে, এমনকি পাকা টয়লেটের ছাদেও মুসল্লিরা রাত্রিযাপন করছেন।
আজ আখেরি মোনাজাতে বেশ কয়েকজন ভিআইপি অংশগ্রহণ করবেন বলে বিশেষ সূত্রে জানা গেছে। মুরব্বিদের বয়ান চলাকালে পুরো ইজতেমা ময়দান জুড়ে পিনপতন নিরবতা নেমে আসে। সকালের ঠান্ডা বাতাস ও কনকনে শীত উপেক্ষা করে মুসল্লিদের অধিক মনযোগ সহকারে বুজুর্গ মুরব্বিদের মূল্যবান বয়ান শুনতে দেখা গেছে।
বিদেশি মেহমানরা মূল বয়ান মঞ্চের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বপাশে হোগলা পাটিতে বসেন। বিভিন্ন ভাষাভাষীর মুসল্লিরা আলাদা আলাদা বসেন এবং তাদের মধ্যে একজন মুরব্বি মূল বয়ানকে তাত্ক্ষণিক অনুবাদ করে শুনান।
স্থানীয় বিভিন্ন এলাকার মসজিদের ইমামদের তত্ত্বাবধানে অগণিত মানুষ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের নিমিত্তে ময়দানে সমবেত হয়ে নফল বন্দেগি ও মাওলানাদের বয়ান শুনেন।
খাস বয়ান ও খুসশি বয়ান : ইজতেমা ময়দানে আগত স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে গতকাল খাস বয়ান করা হয়। এসময় উপস্থিত শিক্ষকদের বিভিন্ন মেয়াদে চিল্লায় বের হওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বয়ান করা হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ছাত্রদের উদ্দেশ্যে খুসশি বয়ান পেশ করা হয়।
মাসলেহাল জামাত কামরা : ইজতেমা ময়দানে আগত মুসল্লিদের নতুন যে কোনো সমস্যা সমাধানকল্পে ময়দানের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে আশরাফ সেতুর পেছনে মাসলেহাল জামাতের কামরা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে বসে ঐ জামাতের মুরুব্বিরা উদ্ভূত সমস্যার সমাধান দিচ্ছেন।
পাঁচ মুসল্লির মৃত্যু : শুক্রবার রাত থেকে গতকাল শনিবার বিকাল পর্যন্ত ইজতেমা ময়দানে পাঁচ জন মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন, রাজশাহীর মুসল্লি আব্দুর রাজ্জাক (৬৪), কুমিল্লার আব্দুল তমিজ (৬৫), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মো. শাহজাহান (৬২), বরিশালের আলী আজগর (৭০) ও ময়মনসিংহের মো. ইউনুস আলী (৪৫)। এনিয়ে ইজতেমায় আগত ৯ জন মুসল্লি মারা গেছেন।
বিদেশি মুসল্লিদের অংশগ্রহণ: ইজতেমার প্রথম পর্বে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চাদ, ইথিওপিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, কাজাখাস্তান, কিরগিজিস্তান, মালয়েশিয়া, মরক্কো, নেপাল, কেনিয়া, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, জর্দান, দুবাইসহ বিশ্বের ৫১টি দেশের ১ হাজার ৮৭৫ জন মুসল্লি ইজতেমা ময়দানে হাজির হয়েছেন বলে জানা গেছে। বিভিন্ন ভাষাভাষী ও মহাদেশ অনুসারে ইজতেমা ময়দানে বিদেশি মেহমানদের ভিন্ন ভিন্ন তাবু নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
গ্রেফতার : এছাড়াও স্থানীয় প্রশাসন বিশ্ব ইজতেমার ময়দান ও আশপাশ এলাকা থেকে হকার, পকেটমার চোর, ছিনতাইকারী ও অজ্ঞান পার্টির সদস্যসহ অর্ধশত অপরাধীকে আটক করে।
যৌতুক বিহীন বিয়ে : এবার ইজতেমা ময়দানে বাদ আছর ১০০ জোড়া বর-কনের যৌতুক বিহীন বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। পারস্পরিক সম্মতিতে বরেরা মূল বয়ান মঞ্চের সামনে উপস্থিত হন আর কনেরা নিজেদের গৃহে অবস্থান করেন। বিয়ে শেষে উপস্থিত মুসল্লিদের মধ্যে খুরমা খেজুর বিতরণ করা হয়। মাওলানা জোহায়েরুল হাসানের বয়ানের পর তিনি এই বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন।
তাবলিগ জামাতের অন্যতম বৃহত্তম এই সম্মিলনের নিরাপত্তা ও মুসল্লিদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) পক্ষ থেকে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) কে এম আরিফুল হক জানান, ইজতেমাকালীন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা যানবাহন পার্কিংয়ের স্থান নির্ধারণসহ ১২ জানুয়ারি (রবিবার) ইজতেমার আখেরি মোনাজাত উপলক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিভিন্ন সড়কে যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। তিনি বলেন, রবিবার ভোর ৪টা থেকে পরদিন দুপুর ২টা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকার সড়ক-মহাসড়কে সবপ্রকার যানচলাচল বন্ধ রাখা হবে। যানচলাচল বন্ধ রাখার স্থানগুলো হচ্ছে—বিমানবন্দর থেকে ভোগড়া পর্যন্ত, টঙ্গী স্টেশন রোড ক্রসিং থেকে মীরের বাজার পর্যন্ত এবং মুন্নুগেট হতে কামারপাড়া ও আব্দুল্লাহপুর বাইপাশ থেকে তুরাগ বেড়িবাঁধ পর্যন্ত। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, রবিবার আখেরি মোনাজাত বিধায় মুসল্লিদের চাপ বেশি থাকবে।