‘অটিজম’-এ আক্রান্ত শিশুদের মা-বাবাকে উদ্ভ্রান্তের মতো এক চেম্বার থেকে আরেক চেম্বারে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব শিশুকে স্বাভাবিক করে তোলার অমূলক স্বপ্ন দেখিয়ে থাকেন অনেক অসাধু চিকিত্সক। তবে মিথ্যা আশ্বাস নয়: এবার সত্যি সত্যি মা-বাবার সেই আশাকে জোরালো করেছে ভারতে অনুষ্ঠিত অটিজম সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এই সম্মেলন থেকে চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা আবারও আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, অটিজম মানে মানসিক প্রতিবন্ধকতা নয়।
‘সম্মিলিত’ নামের তিন দিনের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন গত শুক্রবার শুরু হয়েছে নিউটাউনে অ্যামিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর আয়োজক ছিল ‘ইন্ডিয়া অটিজম সেন্টার (আইএসি)’। অভিনব এই সম্মেলনে এসেছেন অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের মা-বাবা, চিকিত্সক, মনোবিদ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, এমনকি স্নায়ুবিজ্ঞানীরাও। ভারত ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও এসেছেন।
অটিজমের প্রাথমিক লক্ষণ শিশু কথা বলতে শেখে না। বললেও জড়িয়ে যায়। গলার স্বরও অন্য রকম হয়। দৃষ্টি ঝাপসা হয়। কারো সঙ্গে মিশতে শেখে না শিশু। এমনকি মা-বাবার থেকেও দূরে থাকতে চায়। চট করে রেগে যায়। জন্মের মাস ছয়েক পর থেকেই এটা শুরু হয়। কিন্তু ওই সময় সাধারণত কোরো শিশু কথা বলতে শেখে না বলে চট করে অটিজমের প্রাথমিক লক্ষণগুলো ধরা পড়ে না। শিশুরা মোটামুটি তিন বছর বয়সের আগে তেমনভাবে কথা বলতে শেখে না বলে অটিজম ধরা পড়ে অনেক দেরিতে। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের প্রথমে মানসিক প্রতিবন্ধী ভাবা হয়। তাই অধিকাংশেরই চিকিত্সা হয় না। হলেও ভুল চিকিত্সা হয়।
ইন্ডিয়া অটিজম সেন্টারের চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ট্রাস্টি সুরেশ সোমানি জানান, অটিজম নিয়ে গবেষণা কোন দিক দিয়ে কীভাবে এগুচ্ছে, তা চিকিত্সক, মনোবিদ ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের জানাতে, বোঝাতেই এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন। শিশুদের অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা করে চলেছেন স্নায়ুবিজ্ঞানীরা। যাতে তারা বুঝতে পারেন শিশু রোগীদের গলদটা কোথায়। কীসে ধরা পড়ে অটিজম।
কলকাতার ‘অ্যাপোলো’ হাসপাতালের বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জয়রঞ্জন রামের কথায়, সম্মেলনের লক্ষ্য, অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের সারিয়ে তুলতে তাদের পরিবার, চিকিত্সক ও ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলোকে আরো সচেতন করা। তবে বিদেশে অটিজমকে এখন আর ‘ডিজ-অর্ডার’ বলা হয় না। বলা হয়, ‘কন্ডিশন’। সেভাবেই আক্রান্ত শিশুদের চিকিত্সা করা বা তাদের সঙ্গ দেওয়া হয়। চিকিত্সার ক্ষেত্রে কীভাবে এগোলে শিশু রোগীদের অটিজমের হাত থেকে কিছুটা রেহাই দেওয়া সম্ভব হতে পারে, সেটাও অনেকটা বুঝতে পারবেন ডাক্তাররা।
বেঙ্গালুরুর ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস (এনসিবিএস)’-এর অধ্যাপক ও ‘সেন্টার ফর ব্রেন ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিপেয়ার’-এর প্রধান সুমন্ত্র (সোনা) চট্টোপাধ্যায় জানান, অটিজমের তেমন কার্যকরী ওষুধ বাজারে না আসার কারণ, ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় সাফল্যের পর মানুষের ওপর পরীক্ষায় তা সফল হয়নি। দ্বিতীয়ত, এত দিন জানাই ছিল না বিভিন্ন ধরনের অটিজমের মধ্যে বিশেষ একধরনের অটিজম (যার নাম ‘ফ্রাজাইল এক্স সিনড্রোম’)-এর জন্য মস্তিষ্কের কোন কোন কোষগুলো দায়ী। এ বার সেটা জানা গিয়েছে। ফলে ‘ফ্রাজাইল এক্স সিনড্রোম’র কার্যকরী ওষুধ বাজারে আসার সম্ভাবনা যথেষ্টই জোরালো হলো। —আনন্দবাজার