তপন কুমার দাস
বড়লেখা (মৌলভীবাজার)
রাত সাড়ে ১১টা। শীতের কুয়াশা মোড়া অন্ধকারে ডুবে আছে বিশাল হাকালুকি হাওর। কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। দূর থেকে ভেসে আসছিল বাঁশি আর গানের সুর। বাঁশি ও গানের সুর ছড়িয়ে পড়ছে হাওরের বুকে। সেই সুরের টানেই অনেকেই ছুটছেন হাকালুকি হাওরের বালিজুরি বিল এলাকায়। প্রচণ্ড শীতের হিম বাতাস। বৃষ্টিতে কর্দমাক্ত হাওরের পথ। এসব কিছুই তাদের আটকাতে পারেনি। বাউল গানের প্রতি প্রাণের টান তাদের সুরের ঘোরে ফেলেছে।
গত ৩ জানুয়ারি বড়লেখা উপজেলার হাকালুকি হাওরের বালিজুরি এলাকায় জলবায়ু সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ২ দিনব্যাপী হাকালুকি ক্যাম্প-২০২০ আয়োজন করে স্থানীয় মাছরাঙা প্রকাশন। ৪ জানুয়ারি বিকেল পর্যন্ত এই ক্যাম্প চলে। ক্যাম্প উপলক্ষে ছিল বাউল গান ও ধামাইল নৃত্য। কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ছাড়াই বিচ্ছেদি, দেহতত্ত্বসহ নানারকম বাউল গানের টানে বিভিন্ন বয়সের মানুষ ছুটে যান হাওরের গানের আসরে। গভীর রাত পর্যন্ত চলে গান। হাওরে কুয়াশা ঝরা রাতকে মাতায় নিয়েই সুরের মায়াজালে বাঁধা ছিলেন শ্রোতারা। অপরদিকে এর ফাঁকে গান শুনতে আসা লোকজনের সঙ্গে হাওরের পরিবেশ রক্ষা ও প্লাস্টিক সামগ্রীর ক্ষতিকর দিকসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন ক্যাম্প কর্মসূচির প্রধান সমন্বয়ক লেখক আবুল কাশেম ও সমন্বয়ক কবি মৃণাল কান্তি দাস।
আয়োজকদের সূত্রে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও প্লাস্টিক সামগ্রীর ক্ষতিকর দিক নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরের বড়লেখা অংশের বালিজুরি বিল এলাকায় ২ দিনব্যাপী এ ক্যাম্প করা হয়। শুক্রবার সকালে সেখানে ৯টি অস্থায়ী তাঁবু স্থাপন করে পর্যটকদের রাতযাপনের ব্যবস্থা করা হয়। দুপুরের দিকে পর্যটকরা ক্যাম্পে এসে পৌঁছান। এ ক্যাম্পে দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে ২৫ পর্যটক অংশ নেন। রাতে বাউলশিল্পী আব্দুর রহমান প্রয়াত বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের বিখ্যাত সব গান গেয়ে শোনান। পরদিন শনিবার ভোরে হাওরে অতিথি পাখি, দুপুরে মাধবকুণ্ডু জলপ্রপাত, চা বাগান ও বিকেলে আগর বাগান ঘুরে দেখার মধ্য দিয়ে ক্যাম্পের সমাপ্তি ঘটে।
এর আগে স্থানীয় তালিমপুর ইউনিয়নের হাল্লা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ক্যাম্পের সমাপনী দিনে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পুরস্কার ছাড়াও দেশীয় প্রজাতির পাখি সংরক্ষণে অবদানের জন্য হাল্লা পাখি বাড়ির মালিক মনোহর আলী মাস্টারের ছেলে শাহরিয়ার আহমদকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
আয়োজনের সমন্বয়ক মৃণাল কান্তি দাস বলেন, ‘২ দিনব্যাপী ক্যাম্পে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও প্লাস্টিক সামগ্রীর ক্ষতিকর দিক নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আলোচনা করা হয়। স্থানীয় লোকজনকে সম্পৃক্ত করতে আমরা বাউল গানের আয়োজন করি। কোনো মাইক ব্যবহার করা হয়নি। নিয়ম করে কোনো আমন্ত্রণও জানানো হয়নি কাউকে। কিন্তু স্থানীয় লোকজন একদম প্রাণের টানে সাড়া দিয়েছেন। সে সুযোগে গানের ফাঁকে ফাঁকে আমরা হাওরের অতিথি পাখিদের সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও প্লাস্টিক সামগ্রীর ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচনা করি। এর পাশাপাশি পর্যটকরা হাওর ঘুরে ঘুরে পরিযায়ী পাখি দেখেন। এ সময় অতিথি পাখি শিকার না করতে স্থানীয়দের সঙ্গে তারা কথা বলেন।’