অনুমিতভাবেই ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমন্সে ৩৩০-২৩১ ভোটের ব্যবধানে ব্রেক্সিট প্রস্তাব পাশ হইয়াছে। ব্রেক্সিটের বিপদ সম্পর্কে কয়েকজন এমপি কিছু কথা বলিলেও তাহাতে কিছু আসে-যায় নাই। বস্তুত, গত মাসে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনের ফলাফলেরই প্রতিফলন ঘটিয়াছে কমন্স সভাতে। এই ঘটনার মধ্য দিয়া চলতি মাসের ৩১ তারিখের মধ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) হইতে ব্রিটেনের সরিয়া আসিবার পথ উন্মুক্ত হইয়াছে। বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, কথামালার রাজনীতির উপরে ভর করিয়া দেশের ভিতরের রাজনীতিতে বাজিমাত করিলেও, এইবার প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে নেতৃত্বের আসল পরীক্ষায় পড়িতে হইবে। বিশেষ করিয়া চলতি বত্সরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্রেক্সিটের অন্তর্বর্তীকালীন মেয়াদে ইইউ-ব্রিটেনের ভবিষ্যত্ সম্পর্কের রূপরেখা নির্মাণ করাই হইবে তাহার প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই ক্ষেত্রে ইউরোপীয়রা যে ব্রিটেনকে এতটুকু ছাড় দিবে না তাহা অনেক পূর্ব হইতেই জানাইয়া রাখা হইয়াছে।
ব্রেক্সিটের পরে ইইউ-ব্রিটেন বাণিজ্যের ধরন নির্ণয় করার কাজটিই হইবে সর্বাপেক্ষা জটিল। ইইউয়ের সহিত বাণিজ্যে ব্রিটেন শুল্কমুক্ত থাকিবে কি না কিংবা অ-ইইউ দেশ হিসাবে বাণিজ্য কোটার মধ্যে পড়িয়া যাইবে কি না—এইগুলি হইতেছে প্রধান বিবেচ্য। এই ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ কতদূর পর্যন্ত মতৈক্যে পৌঁছাইতে পারে তাহাই দেখিবার বিষয়। উল্লেখ্য, পণ্য ও সেবা খাতে ব্রিটেনের ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন পাউন্ড বাণিজ্যের ৪৯ শতাংশই হইতেছে ইইউভুক্ত দেশগুলির সহিত। বুঝিতে অসুবিধা হয় না যে ইউরোপীয়দের সহিত ঠিকঠাক বুঝাপড়ায় পৌঁছিতে না পারিলে ব্রিটিশ অর্থনীতি সামনের দিনগুলিতে ঝুঁকিতে পড়িতে পারে। ব্রেক্সিটের কারণে ব্রিটেনকে অবশ্য আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো বৃহত্ বাণিজ্য-অংশীদারদিগের সহিতও নূতন করিয়া বাণিজ্য-সম্পর্ক সাজাইতে হইবে। ব্রেক্সিট হইবার পরে অভিবাসন-নীতি লইয়াও চাপের মুখে পড়িতে হইবে ব্রিটেনকে। উল্লেখ্য, বর্তমানে ইইউভুক্ত দেশের নাগরিকেরা যে কোনো সদস্য দেশে বিনা বাধায় ভ্রমণ ও বসবাস করিতে পারেন। ব্রেক্সিট-বিরোধীরা এই নিয়মের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরিয়া জনমত জড়ো করিয়াছিলেন। কিন্তু এখন আর মেঠো রাজনীতিতে কাজ হইবে না। কেননা ইইউ দেশগুলিতে বসবাসরত প্রায় দেড় মিলিয়ন ব্রিটিশ নাগরিকের ভবিষ্যত্ কী হইবে সেই জবাবও বরিস জনসনের সরকারকে প্রস্তুত করিতে হইবে বৈকি। অন্তর্বর্তীকালীন মেয়াদ সমাপ্ত হইবার পরে বাণিজ্য ও অভিবাসন-নীতির বাইরেও একগাদা সমস্যা জনসনকে আঁকড়াইয়া ধরিবে। আইন প্রয়োগ, ডাটা বিনিময় ও নিরাপত্তা, বিদ্যুত্ ও গ্যাসের সরবরাহ, ঔষধপত্রের লাইসেন্স ও বিধিবিধানের ক্ষেত্রে এতদিন পর্যন্ত ইইউয়ের নিয়মাবলিই প্রাধান্য পাইয়াছে। কিন্তু ব্রেক্সিটের বরাতে একদিকে একলা-চলা অন্যদিকে ইইউয়ের সহিত ভারসাম্য রক্ষা করার মতো জটিল কাজটিই করিতে হইবে ব্রিটেনকে। কট্টর ব্রেক্সিটপন্থিরা এতদিন ব্রিটেন একা-একাই সর্বেশ্বর বলিয়া ভাব প্রকাশ করিতেছিলেন; এইবার উহাদের দৌড় দেখা যাইবে।