মীর আব্দুল আলীম
জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘দশ বছর আগের আর আজকের বাংলাদেশের মধ্যে বিরাট ব্যবধান।’ কথাটা কিন্তু নিরেট সত্য। এ সময়ে আমাদের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে, আমাদের সংগতি বেড়েছে। বাংলাদেশ এখন আর হেনরি কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক ধেকে এগোচ্ছে দেশ। রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। স্বপ্নের মেট্রোরেল হচ্ছে। পদ্মা সেতু হচ্ছে বাংলাদেশের গাঁটের টাকায়। এটা চাট্টিখানি কথা নয়। আমাদের পত্রিকাগুলোও আজকাল লিখছে—‘বাংলাদেশের অর্থনীতির ঝুড়ি এখন টইটম্বুর’। সত্য কথা। তবে এও সত্য আমরা এখনো সভ্য নই। সভ্য হতে পারিনি। আমাদের রূপ বদলেছে, মানুষের ভেতরটা এখনো বদলায়নি। তাই কথায় কথায় ধর্ষিত হয় আমাদের নারীরা। এখনো আমরা আইন মানি না, অফিস-আদালতে ঘুষ-দুর্নীতির আশ্রয় নিই, খাদ্যে ভেজাল দিই।
আগে যারা তিন বেলা খাবার পেত না এখন তারা মোটামুটি সচ্ছল। সবারই সংগতি বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে বাংলাদেশ উন্নত দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা এগোচ্ছি, উন্নত হচ্ছি, কিন্তু সভ্য হচ্ছি না, হতে পারছি না। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য অনেক দেশেই ছুটে গেছি। তা প্রায় ৩৫-৩৬টি দেশ হবে। যেসব দেশকে খুব দরিদ্র ভাবতাম, তারা আমাদের চেয়ে সভ্যতায় অনেক বেশি এগিয়ে। ভুটানে যাইনি এই ভেবে—পাহাড় আর গরিব দেশে কী দেখব, আর শিখবই-বা কী? আমার পরিচালনাধীন আল-রাফি হাসপাতাল লিমিটেডের পরিচালক ও ডাক্তারদের নিয়ে গত বছর এক অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে মিয়ানমার ও ভুটানে যাই। আমরা ৮ লাখ মানুষের দেশ থেকে অনেক কিছু শিখলাম। মানুষ সভ্য হলে পুলিশ প্রশাসনের তেমন দরকার হয় না। ৪৬ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার দেশের মানুষ আইন মেনে চলে। নিজ চোখে যা দেখলাম তা-ই লিখছি। ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত ভুটান একটি বিচ্ছিন্ন দেশ ছিল। ১৯৬০-এর দশকে ভারতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য নিয়ে দেশটি একটি সভ্য রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। তবে এখনো এটি বিশ্বের সবচেয়ে অনুন্নত দেশগুলোর একটি। হাসপাতালের ডাক্তার ও পরিচালকদের নিয়ে মাত্র পাঁচ দিন ছিলাম। এ অল্প সময়েই নিজেকে সুস্থ অনুভব করলাম। খাবারের ভীতি ছিল না। নিম্নমানের হোটেলগুলো আমাদের পাঁচতারকা হোটেলের মতো পরিচ্ছন্ন। ফল-ফলাদি খেলেই বোঝা যায় ভালো কিছু খাচ্ছি। দরিদ্র দেশটির মানুষগুলো পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করে। পোশাক-আশাক দামি না হলেও আছে আধুনিকতার ছাপ।
সবচেয়ে বড়ো কথা, ওরা আইন ভাঙে না কখনো। ঐ দেশে চুরি ডাকাতি নেই। যদি থাকত মাইলকে মাইল পাহাড়ি নির্জন পথে আমরাই ডাকাতের কবলে পড়তাম। রাস্তায় ৫ দিনে পুলিশ দেখেছি একজন মাত্র। রাস্তার আইন ওরা শতভাগ মানে। তাই দুর্গম পথেও দুর্ঘটনা নেই বললেই চলে। আমাদের বহনকারী ট্যুরিস্ট বাসটি নির্দিষ্ট জায়গাতেই থামছিল। আমরা কোনো দর্শনীয় জায়গা পেলে নামতে চাইলেও বলছিল এখানে থামার নিয়ম নেই। ত্রিসীমানায় কেউ নেই তবুও নিজ থেকেই ড্রাইভার নিয়ম মেনে চলছে। কখনো মোবাইল ফোন ধরার প্রয়োজন হলে গাড়ি থামিয়ে কথা শেষ করে তবেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন তিনি। পথচারীর চেয়েও ড্রাইভাররা অনেক বেশি সচেতন। পথচারী পথ পার হবে বুঝতে পেরে বহু আগে থেকেই গাড়ি থামিয়ে বসে থাকে ড্রাইভার। এমন নিয়ম কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, জাপানে দেখেছি। বোধ করি তার চেয়েও গরিব দেশটিতে ড্রাইভাররা অনেক বেশি সচেতন মনে হয়েছে আমার। এখানে সিসি ক্যামেরা ও পুলিশের নজরদারি নেই, আইন না মানলেও দেখার কেউ নেই, তবুও ওরা আইন মানছে। ওরা সভ্য, তাই সড়কে নিরাপত্তা বেশি। পাঁচ দিন সড়কে নির্ভয়ে চলেছি। ভীতি ছিল না। আমাদের ফুটপাত দিয়ে চলতেও ভয় পাই, কখন গাড়ি গায়ে উঠে যায়। আমরা কখনোই ভাবি না আমরা সভ্য হলেই দেশটা সভ্য হয়। বিদ্যুতের অভাবনীয় সাফল্য এবং শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য, একটি বাড়ি একটি খামার, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের উন্নতি ইত্যাদি কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার তিন বছর ধরে রয়েছে ৭ শতাংশের ওপরে। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অনেক প্রভাবশালী দেশকে ছাড়িয়ে যাবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, যা নিয়ে দেশের নীতিনির্ধারকসহ বিভিন্ন মহল স্বাভাবিকভাবেই বেশ উচ্ছ্বসিত। কিন্তু উচ্ছ্বসিত নই সভ্যতায়। খাবারে ভেজাল বাড়ছে, সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে, দুর্নীতি বাড়ছে। আগে পুলিশকে ২০০-৫০০ টাকা দিলে চলত। পরে হাজার, লাখ ছাড়িয়ে কোটির অঙ্কে ঘুষ লেনদেন হয়। ভূমি অফিসে, সাবরেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ম করে, কাজের প্রকারভেদে নানা অঙ্কের ঘুষের লেনদেন চলে। হাসপাতালে দুর্নীতি চলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও চলে দুর্নীতি। কোথায় নেই দুর্নীতি? এক প্রধানমন্ত্রী একা কি দুর্নীতি রোধ করতে পারবেন? দেশটা আমাদের সবার। আসুন, আমরা সবাই মিলে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ি।
ইতোমধ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে প্রথম কৌশল হিসেবে বড়ো আকারের ফার্স্ট ট্র্যাক প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ, ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ। স্বাধীনতার সময়ে আমাদের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি ছিল। সে অবস্থা থেকে এক ধরনের টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা গেছে। এখন স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরে আমাদের চাওয়ার জায়গাটায় একটি পরিবর্তন এসেছে। এখন কেবল সভ্য হতে হবে আমাদের। আমাদের সকল ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হতে হবে। যার যার কাজ তাকেই করতে হবে। দুর্নীতিকে না বলতে হবে। পরিবেশসচেতন হতে হবে। খাদ্যে সচেতন হতে হবে। যোগাযোগ, বিশেষ করে ট্রাফিক আইন মানার বিষয়ে আমাদের সতর্ক হতে হবে। তবেই সোনার বাংলাদেশ গড়তে পারবো আমরা।
n লেখক : গবেষক