উন্নত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বদলে দিতে পারে সমাজ

ফারজানা ইয়াসমিন রুমি

মানসিক স্বাস্থ্য বা মেন্টাল হেলথ বিষয়টি নিয়ে খুব একটা সচেতনতা দেখা যায় না। বেশির ভাগ সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি নিয়ে ভুল ধারণা দেখা যায়। বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা খুব জরুরি। মানসিক স্বাস্থ্য কথাটি দিয়ে মানসিক রোগ বা ডিসঅর্ডার বুঝায় না।

স্বাস্থ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ মানসিক স্বাস্থ্য। মানসিক স্বাস্থ্য বলতে আমাদের মানসিক ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য এবং সামগ্রিক মানসিক কল্যাণ বোঝায়। মানসিক স্বাস্থ্যের দরুন একজন মানুষ সেই ক্ষমতা অর্জন করে, যা তাকে নিজের সঙ্গে এবং তার চারপাশে থাকা অন্যদের সঙ্গে যুক্ত হতে বা একাত্ম হতে সাহায্য করে। মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ বা মানসিক সমস্যাগুলোর সমাধানে শারীরিক সুস্থতা এবং সতেজতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের সঙ্গে মনের সম্পর্ক খুবই গভীর এবং পারস্পরিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শারীরিক সুস্থতার সঙ্গে মানসিক সুস্থতার সম্পর্কটি বেশ জটিল। অর্থাত্ যার টাইপ টু ডায়াবেটিস মেলিটাস রয়েছে, তার মানসিক উদ্বেগের মাত্রাও একজন স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। আমাদের মনে রাখা দরকার যে, মানসিক এবং শারীরিক সুস্থতা দুটিই খুব জরুরি বিষয় এবং একে অন্যের বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। মানুষের শারীরিক স্বাস্থ্যের চেয়েও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অধিকগুরুত্বপূর্ণ। শারীরিকভাবে পঙ্গু হওয়ার পরও মানসিক শক্তির কারণে বহুদূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। মনের শক্তিটা হারিয়ে ফেললে সমাজে নানা অবক্ষয় দেখা দেয়।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশে শারীরিক স্বাস্থ্যকেই অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি সামনে নিয়ে এত দিন কিছু বলেনি। এর পেছনে হলো শারীরিক রোগের আধিক্য। যক্ষা, কলেরা, ডায়রিয়ায় হাজার হাজার মানুষ মারা যাওয়ায় আসলে মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে পারেনি।

স্বাস্থ্য খাতের জন্য জাতীয় বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। মোট বাজেটের মাত্র ৪ শতাংশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পেয়ে থাকে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই বাজেটে মানসিক রোগের জন্য বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মানুযায়ী প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ১০ জন চিকিত্সক থাকা উচিত। কিন্তু আছে মাত্র তিন জন। দেশে ১১ লাখ শিশু এবং ১৬ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় রয়েছে। এত বিশালসংখ্যক রোগীর চিকিত্সার জন্য জনবল বাড়াতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বৈষম্য, উপেক্ষা ও কলঙ্ক—এই তিন কারণে মানসিক সমস্যা হয়ে থাকে। আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু ব্যয় মাত্র ২ দশমিক ৪ টাকা। এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্যে ১ হাজার ৮৯৩ জন পেশাদার রয়েছে। প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য ১ দশমিক ১৭ জন চিকিত্সক রয়েছে। প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে ২ হাজার ৮০০ জন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে কাজে অনুপস্থিত থাকে। এছাড়া প্রতি ১ লাখে ছয় জন আত্মহননের মতো পন্থা বেছে নেয়। এসব মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণেই হয়ে থাকে। এসডিজি অর্জনের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এসডিজির তিন নম্বরে উল্লেখ করা ‘ওয়েল বিং’, আট নম্বরে ‘আত্মহত্যা প্রতিরোধ’ এবং ১০ নম্বরে আছে ‘সাম্যভাব/ন্যায্যতা’—এসবকে কেন্দ্র করে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দিলে আত্মহত্যা প্রতিরোধ সম্ভব হবে না, নারী-পুরুষের, ধনী-দরিদ্রের সমতা অর্জন করা সম্ভব হবে না। অর্থাত্ সবকিছুর সঙ্গে, এই এসডিজি অর্জন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব রয়েছে।

স্বাস্থ্যের যত্ন বা পরিচর্যার কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। যেহেতু বিষয়টি মনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, সেহেতু এটি বিমূর্ত এবং অস্পষ্ট একটি ধারণা। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে।

n লেখক : শিক্ষার্থী, স্বাস্থ্য অর্থনীতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়