লোকদেখানো ‘প্রতিশোধে’ বিপদে ইরান!

শিফারুল শেখ

 

শীর্ষ জেনারেল এবং দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র হত্যার পর ইরান যেভাবে হুমকি দিয়েছিল তাতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহ তৈরি হয়েছিল; কিন্তু সেই পরিস্থিতি এখন অনেকটাই শান্ত। বিশ্লেষকরা বলছেন, অচিরেই যুদ্ধের আশঙ্কা নেই। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করবে বড়ো ধরনের যুদ্ধের মুখোমুখি বিশ্ব হচ্ছে কি না। ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত না হয়ে বরং শান্ত হয়। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান সরকার মূলত দেশের ভেতরের কট্টরপন্থার আবেগ প্রশমিত করতেই এই হামলা চালিয়েছে যা অনেকটা লোকদেখানো বলা যায়। তবে হামলা লোকদেখানো হলেও বাস্তবে কঠোর মার্কিন অবরোধের মুখে পড়তে হয়েছে শিয়া অধ্যুষিত রাষ্ট্র ইরানকে। কেবল তেহরান নয়, দুই দেশের দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে সংকটে ইরাকও।

মেজর জেনারেল কাসেম সোলেইমানি ছিলেন ইরানের রেভ্যুলিউশনারি গার্ডের কুদস ফোর্সের প্রধান। ইরানে খামেনির পর দ্বিতীয় প্রভাবশালী। দেশের সশস্ত্র ও গোয়েন্দা কার্যক্রম নিজেই পরিচালনা করতেন। একই সঙ্গে ইরাকের সামরিক বাহিনীতেও তার ব্যাপক প্রভাব ছিল। ব্যতিক্রমী অথচ সফল সমরকৌশলের কারণে চলিত বিশ্বে তিনি এক আলোচিত চরিত্র। তার মৃত্যুতে ইরানের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এরকম আরেক জন জেনারেল পাওয়া ইরানের জন্য কঠিন হবে বইকি।

 

n তেহরানের হামলা লোকদেখানো!

গত নভেম্বর থেকে ইরানে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন চলছিল। সরকার এই বিক্ষোভের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোকে দায়ী করছিল। বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থানে ছিল সরকার। সোলেইমানি হত্যার পর তার জানাজায় মানুষের সমাগম সেই বিক্ষোভে পানি ঢেলে দিয়েছে। সরকার জাতীয়তাবাদী আদর্শের সুবিধাটুকু পেয়েছে; কিন্তু উদারপন্থি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সরকারের ওপর চাপ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি থেকে শুরু করে সামরিক কমান্ডারদের মুখে ছিল কড়া বদলা নেওয়ার হুমকি; কিন্তু গত বুধবার ইরাকের দুইটি সামরিক ঘাঁটিতে ২২টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর প্রথমে ৮০ মার্কিন সেনা হত্যার দাবি করে তেহরানের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ বলেছিলেন, ইরান তার বদলা নিয়েছে। আর সামনের দিকে যেতে চান না তারা। তার এই বক্তব্যেই বোঝা যায়, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে খ্যাপাতে চাইছে না। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তিনি বলেন, ইরান ক্ষান্ত দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে; কিন্তু ক্ষুব্ধ ইরান কেন এমন হামলা চালাল? আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রথমত ইরানে আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সোলেইমানিকে হত্যার পর কেবল যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব নয়, ধর্মীয় কট্টরপন্থি দলের প্রভাবও বেড়ে গেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধ নেওয়ার পক্ষে। তাই কোনো পদক্ষেপ না নিলে আগামী নির্বাচনে রক্ষণশীলরাই জয় পাবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। এজন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ প্রশমিত করতেই হাসান রুহানির সরকার লোকদেখানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। দ্বিতীয়ত রুহানির সরকার চিন্তা করেছে, তারা সংযত থেকে মানুষের সহানুভূতি আদায় ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পথে থাকলে ইরান এই সংকট থেকে লাভবান হতে পারে। সামরিক বদলার পথে গেলে উলটো ফল হতে পারে। আমেরিকার বিরুদ্ধে যে কোনো সামরিক ব্যবস্থার পরিণতিতে অপেক্ষাকৃত অনেক দুর্বল ইরান দীর্ঘমেয়াদি একটি লড়াইয়ের চক্রে পড়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যেই ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। কোনো যুদ্ধ ইরানকে আরো একঘরে করে ফেলবে। এরপরও ছাড়েনি যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানের ওপর আরো নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দেশটি। ভবিষ্যতে আরো নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। অর্থাত্ বিপদ ইরানের পিছু ছাড়ছে না।

 

n ইরাকে শিয়ারা লাভবান হলেও ক্ষতি সাধারণের

বর্তমান সংকট থেকে স্বল্প মেয়াদে হলেও ইরাকে ইরান সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো লাভবান হতে পারে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুর্নীতি এবং অপ্রতুল নাগরিক সুযোগ-সুবিধার প্রতিবাদে ইরাকে সরকারবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। কয়েকশ বিক্ষোভকারীর প্রাণ গেছে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে। সেসময় ইরানের প্রভাব নিয়েও অনেক ইরাকি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। বিক্ষোভে হামলার জন্য ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করা হয়েছে; কিন্তু এখন এসব মিলিশিয়া গোষ্ঠী এবং সেই সঙ্গে ইরাকের সরকার সোলেইমানির হত্যাকাণ্ডকে কাজে লাগিয়ে জনগণের সামনে প্রমাণ করার সুযোগ পেয়েছে যে, ইরাকের সার্বভৌমত্বের জন্য তাদের অস্তিত্ব জরুরি।

শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো বহুদিন ধরেই চাইছে মার্কিন সৈন্যরা যেন ইরাক ছেড়ে চলে যায়। সোলেইমানির মৃত্যুতে তাদের সেই দাবি জোরদার করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পার্লামেন্টেও বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার নিয়ে প্রস্তাব পাশ হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ সৈন্য প্রত্যাহার না করার কথা জানিয়েছে। শনিবারও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে সৈন্য প্রত্যাহার না করার বিষয়টি জানিয়েছে। বরং ইরাকের সঙ্গে আর্থিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ভবিষ্যতে কেমন হবে সেটিকেই ওয়াশিংটন গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তো ইরাক সরকারকে ৩৫ বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে সাধারণ ইরাকিরা দ্বন্দ্বের ফাঁদে পড়লেও শিয়া মিলিশিয়ারা লাভের মুখ দেখছে। এসব বিবেচনায় পরিস্থিতি আপাতত শান্ত হলেও যুদ্ধ এমন এক চক্র যেখানে প্রবেশ সহজ হলেও বের হওয়া কঠিন।