স্বাধীন কাতালোনিয়া এক ‘সুপ্ত’ স্বপ্ন

শফিকুর রহমান রয়েল

 

গত দুই বছর ধরে কাতালোনিয়ার নিয়তি গিলে রেখেছে স্পেনীয় রাজনীতিকে। ২০১৭ সালে দেশের সুপ্রিম কোর্টের অসম্মতি সত্ত্বেও বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা বিতর্কিত স্বাধীনতা সংশোধনীর বন্দোবস্ত করেছিল। পরের বছর অক্টোবরে ঐ সর্বোচ্চ আদালতই কতিপয় কাতালোনীয় নেতাকে শুনিয়ে দেয় দীর্ঘমেয়াদি জেলের রায়। ফলশ্রুতিতে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বাধ্য হয়েই তাদের আন্দোলনকে নিয়ে যায় বার্সেলোনার রাস্তায়। তখন থেকেই বিক্ষোভ আপাতদৃষ্টিতে প্রাণ হারালেও এর অন্তরালে কিন্তু ঠিকই জিয়ে রয়েছে বিভক্ত হওয়ার দাবি সমর্থনকারীদের সক্রিয়তা। এখন, স্পেনের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ নতুন সরকার গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন স্পেনীয় সংসদের কাতালান স্বাধীনতাপন্থি দল ইআরসিকে নিয়ে। এই ইআরসির আইনপ্রণেতারা ঠিকই তাদের নবপ্রাপ্ত প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সংসদের সম্পাদ্য কার্যাবলিতে ফের তাদের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার জোর প্রচেষ্টা চালাবে এবং ঘটার সম্ভাবনাই বেশি।

এখন প্রশ্ন উঠছে, পেদ্রো সানচেজ ইআরসির হাত ধরে সরকার গঠন করলে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা কি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে অর্থবহ ছাড় আদায় করে নিতে পারবে কি-না? সম্প্রতি ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনে চিন্তার খোরাক জাগানো এক নিবন্ধে (এ ওয়ে আউট অফ স্পেইনস কাতালান ক্রাইসিস) লাইয়া বালসেলস ঐ ব্যাপারে নেতিবাচক উত্তর দিয়েছেন। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, এ ইস্যুতে মাদ্রিদ অনমনীয় অবস্থান নিয়েছে। আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, বাস্ক ভূখণ্ডের হিংস্র বিচ্ছিনতাবাদীদের আন্দোলনকে যুদ্ধরূপে গ্রহণ করেছে। তাদের দমাতে আগের সরকারের নীতি ছিল ‘নো টলারেন্স’। বালসেলসের মতে, এমন একগুঁয়েমি উভয় পক্ষের চ্যুতিরেখাগুলোকে কেবল গভীরতরই করবে। কেন্দ্রীয় সরকার কেবল তার ধারা পালটালে, বিশেষত বৈধ ও বাধ্যবাধকতাপূর্ণ সংশোধনী অধিবেশন আহ্বান করলেই স্বাধীনতা ইস্যুর নিশ্চলতা ভাঙা সম্ভব। সত্যি বলতে, বালসেলস স্বাধীনতাদ্বন্দ্বের চরিত্রাঙ্কনও করেননি এবং এমন কোনো উপদেশও দেননি যে, কীভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়ে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

বালসেলস যুক্তি দেখিয়েছেন যে, কাতালান বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি স্প্যানিশ সরকারের বিরোধিতা হচ্ছে আধুনিক স্পেনের ‘উপজাতীয় বৈচিত্র্যের প্রতি গভীর অবিশ্বাসের’ প্রতীকস্বরূপ। ভদ্রমহিলা স্পেনীয় জাতি গঠনকর প্রকল্পের দুর্বলতার বিধানের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কার্যত স্পেন হতার বিভিন্ন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিশিষ্টতা সংরক্ষণ ও উন্নতির জন্যে দীর্ঘমেয়াদি সব প্রকল্প গ্রহণ করে। একটি আন্তর্জাতিক প্রকল্প হাতে নেওয়ার জন্যে ৮১টি দেশের ওপর একটি জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, আঞ্চলিক কর্তৃত্ব সূচক অনুসারে স্পেন হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিকেন্দ্রীভূত দেশগুলোর একটি। আরো সরাসরি বললে বিকেন্দ্রিকরণের বিবেচনায় জার্মানির পরেই তার অবস্থান।

কাতালোনীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের ইতিহাস অবশ্য একবারে নতুন নয়। এর আগে ২০১৪ সালের অক্টোবরেও দেশের সুপ্রিম কোর্ট দীর্ঘমেয়াদি সাজা দিয়েছিল বেশ কয়েকজনকে। তাদেরও অপরাধ ছিল দুই বছর আগে বিতর্কিত স্বাধীনতা সংশোধনী সংগঠিত করা। ২০১৭ সালে এর পুনরাবৃত্তি ঘটে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শেষপর্যন্ত সহিংসতায় রূপ নেওয়ার কারণে পুলিশ লাঠিচার্জ করতে বাধ্য হয় এবং আন্দোলনকারীরা বার্সেলোনায় পিছু হটতে বাধ্য হয়। কাতালোনীয় প্রাদেশিক সংসদে বারবার সংশোধনী আনলেও কেন্দ্রীয় সরকার তার অবস্থানে অনড়। উভয় পক্ষ কোনো সমাধানে পৌঁছুতে পারছে না। মাদ্রিদ আঞ্চলিক সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে অস্থায়ীভাবে আঞ্চলিক সরকার ভেঙে দিয়েছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী পেদ্রা সানচেজ বাম মধ্যপন্থি সোশাল্ট ওয়ার্কার্স পার্টি (পিএসওই) কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের জন্যে স্বাধীনতাপন্থি কাতালান নেতাদের সহযোগিতা চাইলেও তাদের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সংলাপে বসার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দিয়েছেন। এখানে উল্লেখ্য, সানচজের কার্যোপযোগী বামপন্থি সরকার গঠনের জন্যে শুধু কাতালান স্বাধীনতাপন্থিদেরই নয়, বাম চরমপন্থি পাদেমোস দলেরও সমর্থন প্রয়োজন। তবে কাতালান স্বাধীনতাপন্থিদের সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনাকে এই মুহূর্তে বাতিল করে দিলেও ভবিষ্যত্ সম্ভাবনা যে ক্রমশই উজ্জ্বল হচ্ছে, সেকথা অস্বীকার করার জো নেই।  ঐতিহাসিক ও কৌশলগত কারণগুলো বিশ্লেষণ করলেও বলতে হয়, যেকোনো অর্থবহ সমঝোতায় পৌঁছার জন্য মাদ্রিদের ওপর ক্রমশই চাপ বৃদ্ধি পাবে। তবে মাদ্রিদের এই অনমনীয় অবস্থানের হেতু খুঁজতে গেলে কয়েক শতাব্দী পেছনে যেতে হবে। প্রতিবেশী ফ্রান্সের তুলনায় অতীতে অভিন্ন স্পেনীয় জাতি গঠনকর প্রকল্পে এতোটা মনোযোগ দেওয়া হয়নি। যার ফলশ্রুতিতেই এই কাতালোনীয় সমস্যার সৃষ্টি। বাস্ক প্রদেশের রাজধানী বার্সেলোনায় অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় কলকারখানা বেশি হলেও তাদের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের সুদৃষ্টি নাকি বরাবরই কম। এটা তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না।