মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও শান্তি কামনা

আখেরি মোনাজাতে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের মুহুর্মুহু ‘আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে মুখরিত ছিল বিশ্ব ইজতেমা ময়দান। মোনাজাতে মহান আল্লাহর কাছে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি, অগ্রগতি, সমৃদ্ধি, ইহলৌকিক কল্যাণ, পারলৌকিক মুক্তি এবং দিনের দাওয়াত সারা বিশ্বে পৌঁছে দেওয়ার তৌফিক কামনা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে গতকাল রবিবার তাবলিগ জামাতের ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার আলমি শুরার প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে।

গতকাল বেলা ১১টা ৮ মিনিটে শুরু হয়ে ১১টা ৪৬ মিনিটে শেষ হয় বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের মোনাজাত। দীর্ঘ ৩৮ মিনেটের মোনাজাতে প্রথম ১৮ মিনিট আরবিতে এবং পরে ২০ মিনিট বাংলায় মোনাজাত করেন কাকরাইল জামে মসজিদের পেশ ইমাম           ও তাবলিগ জমাতের শীর্ষ মুরব্বি হাফেজ মাওলানা যোবায়ের আহমেদ। বিশ্বের ৫১টি দেশের দুই সহস্রাধিক প্রতিনিধিসহ লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন।

আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হলো আলমি শুরা, অর্থাত্ শুরায়ে নেজামপন্থিদের তিন দিনব্যাপী বিশ্ব ইজতেমার প্রথম ধাপ। চার দিন বিরতির পর আগামী ১৭, ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে সাদপন্থিদের ইজতেমা। এ পর্বেও অংশ নেবেন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিসহ ৬৪ জেলার মুসল্লিরা।

মোনাজাত চলাকালীন দীর্ঘ সময় ধরে পুরো ইজতেমা ময়দানে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। কিছুক্ষণ পর পর আমিন-আমিন, ছুম্মা আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো বিশ্ব ইজতেমা ময়দানসহ টঙ্গী শিল্পনগরী।

পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অব্যবস্থাপনায় সড়কের পাশে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করে ইজতেমায় আগত মুসল্লিরা মোনাজাতে শরিক হন। সড়কে চলতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন মুসল্লিরা। উপস্থিত মুসল্লিরা বলেন, এ যেন এক নতুন নজির। বিগত এক যুগেও এত বেশি মুসল্লির সমাগম লক্ষ করিনি বিশ্ব ইজতেমায়। দেশের মানুষের মধ্যে ধর্মভিরুতা বেড়েছে, এটা একটা ভালো দিক। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর হেফাজত, ইমান, আখলাক, আমল ও হেদায়েতের দোয়া করা হয় মোনাজাতে।

আল্লাহর কাছে আরো আকুতি জানিয়ে মাওলানা যোবায়ের বলেন, হে আল্লাহ ইজতেমায় শরিক সকল মুসল্লির গোনাহ মাফ করে দেন, সকল মুসলিমের মোনাজাত কবুল করে নেন। হে আল্লাহ আমাদের আখেরাতের দিন সকল গোনাহ ক্ষমা ও সহজ করে দেন। হে আল্লাহ আমাদের ইমানকে মজবুত করে দেন, আমাদের সবার মাঝে মানবতা বৃদ্ধি করে দেন। হে আল্লাহ আমাদের আখলাক হেফাজত করার তৌফিক দান করেন। হে আল্লাহ শয়তানের ধোঁকা থেকে আমাদের হেফাজত করেন। হে আল্লাহ আমাদের নবির সাফায়াত নসিব করেন। হে আল্লাহ আপনি এই ইজতেমাকে কবুল করেন।’

আগামী সালের বিশ্ব ইজতেমা :মোনাজাত শেষে আগামী বছরের (২০২১) বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণা করা হয়। আগামী বছর দুই ধাপেই ৮, ৯, ১০ ও ১৫, ১৬, ১৭ জানুয়ারি বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ২৭ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর ৫ দিনব্যাপী প্রাক্ ইজতেমা (জোড় ইজতেমা) অনুষ্ঠিত হবে বলে আলমি শুরার সিদ্ধান্ত মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। ইজতেমার মোনাজাতের আগে ফজরের নামাজের পর থেকে বয়ান করেন ভারতের মাওলানা আব্দুর রহমান, হেদায়েতের বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা জিয়াউল হাসান এবং ওলামাদের বয়ান করেন ভারতের ইব্রাহিম দেওলা।

ইজতেমায় আরো পাঁচ মুসল্লির মৃত্যু :শেরপুরের আব্দুল কাইয়ুম (৬৫), কিশোরগঞ্জের নূরুল ইসলাম (৬০), কক্সবাজারের আলী আহমেদ (৬১) ও জয়পুরহাটের মুসল্লি আব্দুল মমিন (৫৫) মারা গেছেন। এদিকে ইজতেমায় আসার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মাজহারুল ইসলাম (১৬) নামে এক মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ইজতেমায় চার দিনে ১৪ মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে।

সড়ক জুড়ে বাজার :গতকাল ভোর থেকে টঙ্গীর প্রায় সব রাস্তা পরিণত হয় বাজারে। এমন কিছু নেই, যা পাওয়া যায়নি বাজারে। ইজতেমা-ফেরত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য দোকানিরা উঁচু গলায় চিত্কার করতে থাকেন ‘হাফ রেট-হাফ রেট’ বলে। কম্বল, সোয়েটার, কোট-টাই, শাড়ি, লুঙ্গি, মাছ-মাংস, ডিম, সবজি, গুড়-মুড়ি, আপেল-কমলা থেকে শুরু করে চিনা মাটির তৈজসপত্র, হাড়ি-পাতিল এমনকি মোবাইল ফোন পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। বাজারে সবকিছুর দাম কম—এ খবরে ছুুটে আসতে দেখা গেছে দল বেঁধে নারীদের।

পরিচ্ছন্নতা অভিযান :গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সহপ্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মমর্তা আরিফুর রহমান জানান, দ্বিতীয় পর্বের ময়দান প্রস্তুতি সোমবার সকাল থেকে শুরু হবে। পুরো ময়দানের আবর্জনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইজতেমার দ্বিতীয় দিন থেকে মুসল্লিরা চরম পানির সংকটে পড়েন। বেশ কয়েকটি টয়লেট ছিল অপরিষ্কার। 

আখেরি মোনাজাতে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি মিয়া, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আজমত উল্লা খান, সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলাম, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. আনোয়ার হোসেন প্রমুখ অংশ নেন।