চয়ন

বাঙালির মুক্তির গান

 

বাংলা সাহিত্যে রাজনৈতিক অর্থে স্বদেশচেতনার আবির্ভাব ঘটে ঊনবিংশ শতাব্দীতে। এর আগের চর্চিত স্বদেশপ্রসঙ্গ সীমাবদ্ধ ছিল নিসর্গীয় ও ধর্মীয় অর্থে। চর্যাপদ থেকে রামপ্রসাদের গান পর্যন্ত প্রায় সাত শ বছরের সাহিত্যে দেশাত্মবোধক গান বা কবিতা নেই। বাংলা ভাষার উত্স সংস্কৃত ভাষায় ইংরেজি প্যাট্রিয়টিজম শব্দটির প্রতিশব্দ নেই বলেও আক্ষেপ শুনি বোদ্ধা মহলে। অথচ আমরা কৈশোরেই প্যাট্রিয়টিজম শিরোনামের ইংরেজি কবিতা পড়েছি। তবে কি আমাদের স্বদেশচেতনা পরাধীনতা থেকে উদ্ভূত? দেশপ্রেমের চর্চা ইংরেজদের কাছ থেকে শেখা? এক অর্থে তাই। তাহলে ইংরেজরা ওটা পেল কোথায়? ওরাও তো আক্রান্ত ছিল নর্সমেন দ্বারা, অধীন ছিল নরম্যানদের। আসলে স্বদেশচেতনামূলক গানের পেছনে আছে জাতিরাষ্ট্রের চেতনা, জাতীয়তাবোধ। মডার্ন ন্যাশনালিজমের উদ্ভব ফরাসি বিপ্লব থেকেই বটে। তবে এর অন্যান্য উত্সব রয়েছে, যেমন শক্তিশালী রাজতন্ত্রের শক্ত কেন্দ্রীয়শাসনাধীন রাজ্য। বস্তুত স্বদেশচেতনা ও জাতীয়তাবোধের  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান এবং তাদের ধারাবাহিক উপস্থিতি, যে শর্তটি বঙ্গদেশে পূর্ণ হয়েছে ঊনবিংশ শতকে। তার আগে দেশটিতে ছিল কেবলই উচ্চবিত্ত আর বিত্তহীন, ভূস্বামী আর ভূমিদাস।

বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর বিবিধ প্রবন্ধ গ্রন্থের ‘ভারতকলঙ্ক’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন, নতুন দুটি জিনিস আমরা ইংরেজের চিত্তভাণ্ডার থেকে লাভ করেছি—স্বাতন্ত্র্যপ্রিয়তা আর জাতিপ্রতিষ্ঠা। নবলব্ধ এই দুটি জিনিসের চেতনাই ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে জাগরিত দেশপ্রেমের দুটি প্রধান উপাদান। তাহলে বলতে হয়, বাংলায় দেশাত্মবোধক সাহিত্যের উদ্ভবের প্রধান কারণ ছিল দুটি—রাজনৈতিক ও সামাজিক। তবে অপ্রধান হলেও, তৃতীয় কারণও একটা ছিল—সেটি সাহিত্যিক। সেই শতকের বাঙালি ইউরোপীয় সাহিত্যের স্বদেশপ্রেমে জারিত উদ্দীপনামূলক সাহিত্য থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে। এ বিষয়ে তাঁদের সরাসরি উদ্বুদ্ধ করে থাকবে মুর, ক্যাম্বেল, স্কট, বায়রনদের কবিতা। এইসব কারণের সমাহারই উনিশ শতকে বাঙালির মনে স্বদেশচেতনার সঞ্চার করেছে, যা প্রতিফলিত হয়েছে তার কাব্যে এবং গানে। সারকথা, দেশগান বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি নতুন সংযোজন এবং কালের বিচারে তাকে আধুনিক সৃষ্টি বলতে হয়।

বাংলা দেশাত্মবোধক তথা মুক্তির গানের প্রধান উত্স ছিল বাঙালির পরাধীনতাজনিত বিপর্যস্তবোধ। বস্তুত সব ভাষাতেই দেশগান সৃষ্টির পেছনে প্রধান উপকরণ প্রায়শই একরকম—যে কোনো কারণে দেশটির বিপন্নবোধ। যেমন শেক্সপিয়রের ‘রিচার্ড দ্য সেকেন্ড’ নাটকে জন অব গন্টের মুখে শ্রুত ইংল্যান্ডের প্রকৃতি, ঐতিহ্য এবং কর্মের গৌরবগাথার পটভূমিকায় প্রচ্ছন্ন আছে দেশটির বিপর্যয়ের ব্যথা। বঙ্গেও এহেন ব্যথা অন্তরে পুঞ্জিত হয়ে যখন গণচিত্তকে ক্লিষ্ট করে তুলল, তখনই বাঙালির হূদয় থেকে উত্সারিত হয়ে স্বদেশচেতনা প্রতিফলিত হলো তার সাহিত্যে এবং সংগীতে।      (প্রথমাংশ)

লেখকের ‘বাঙালির মুক্তির গান’ (মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৭) বই থেকে