মশা নেমাটোসেরা মাছি প্রজাতির একটি পতঙ্গ। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩ হাজার ৫০০ প্রজাতির মশক রহিয়াছে। ইহার প্রায় প্রত্যেক ধরনের মশাই জীবাণু বহনের ক্ষমতা রাখে, যাহা মানুষের শরীরে সংক্রমিত হইয়া থাকে। ইহার কোনো কোনো জীবাণুু মরণঘাতি। যেমন এডিস মশা বহন করিয়া থাকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো জীবনঘাতী জীবাণু। কেবল ডেঙ্গুই নহে, মশাবাহিত সংক্রমণের দ্বারা দেশে ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া (গোদ রোগ), পিতজ্বরসহ বেশ কয়েকটি রোগে মানুষ আক্রান্ত হইয়া থাকে। সুতরাং দেখিতে যত ক্ষুদ্রই হউক মশককুল হিংস্র প্রাণীর চাইতে মানুষের জন্য কম ভয়ংকর নহে। যেই মশাগুলি সাধারণত মানুষের শরীরের রক্ত চুষিতে অভ্যস্ত তাহার মধ্যে অ্যানোফিলিস, এডিস, কিউলেক্স এবং হেমাগোগাস অন্যতম। দুর্ভাগ্যবশত এই চার প্রজাতির মশাই বাংলাদেশে রহিয়াছে। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া এবং ঘনবসিতপূর্ণ দেশ হওয়ায় বাংলাদেশে মশার প্রাদুর্ভাব সারা বত্সরই কমবেশি দেখিতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশকে মশার অভয়ারণ্য বলিলে অতিরিক্ত বলা হইবে না।
রাজধানী ঢাকা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে অধিক ঘনবসতিপূর্ণ। স্বভাবতই মশার প্রাদুর্ভাব এবং মশাবাহিত রোগ সংক্রমণও বেশি পরিলক্ষিত হয়। এই মশা নিধনে কার্যক্রম পরিচালনা করিয়া থাকে ঢাকার দুইটি সিটি কপোরেশন। কিন্তু প্রায়শই আমরা লক্ষ করি, মশক নিধন কর্মসূচি শিথিল হইয়া পড়ে। বিশেষ করিয়া রোগের প্রকোপ কমিলে হয়তো কর্তৃপক্ষ মশক নিধনের কথা ভুলিয়া যায়। কিন্তু এই কর্মসূচি শিথিল করিবার সুযোগ নাই। মশার নিধন প্রক্রিয়া সব ঋতুতে, সর্বসময় চালাইয়া যাইবার কথা। দ্বিতীয়ত, কেবল মশার ঔষধ ছিটানোই মশামুক্ত থাকিবার একমাত্র উপায় নহে। রাজধানীর ১৩৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে ছয় বর্গকিলোমিটা জলাশয় রহিয়াছে। দুই সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সরকারি বেসরকারি সংস্থা এইসব জলাশয়ের মালিক। এইসব সংস্থার নিজ নিজ জলাশয় পরিচ্ছন্ন রাখিবার ও মশক নিধনের দায়িত্ব থাকিলেও, সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে কোনো সংস্থা পালন করিতেছে না বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। সেই সঙ্গে যেই ৩০০ কিলোমিটার কার্পেটিং ড্রেন রহিয়াছে তাহাও সঠিকভাবে মশকমুক্ত করা হইতেছে না। দুঃখের বিষয়, মশক নিধন কার্যক্রমের বিষয়ে প্রায়ই বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ ও সংস্থা একে অন্যের উপর দায় চাপাইয়া থাকেন। ইহা মোটেও কাঙ্ক্ষিত নহে। আমরা জানি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগে অপারেশন চালানো হইয়া থাকে। কিন্তু ইহা সর্বদা বজায় রাখা প্রয়োজন বলিয়া আমাদের পরামর্শ। এই মুহূর্তে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম বটে, কিন্তু যে কোনো সময় ইহা যে মহামারি আকার ধারণ করিতে পারে তাহা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষদিগের স্মরণে রাখা প্রয়োজন। মোদ্দা কথা, আমরা মশকমুক্ত একটি ঢাকা শহর দেখিতে চাই। দেশের এত এত কর্তৃপক্ষ থাকিতে ক্ষুদ্র মশা মানুষ কামড়াইয়া হাসপাতালে পাঠাইবে, ক্ষেত্রবিশেষ জীবন কাড়িয়া লইবে ইহা মোটেই মানিয়া লওয়া যায় না।