জয়া ফারহানা
প্রাণী হিসেবে পরিবেশের বাকি উপাদানের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের ধরনটি কী, তা বুঝতে না পারলে পৃথিবী থেকে প্রথম বিদায় নিতে হবে মানুষকে। এটি জীববিজ্ঞানী জর্জ শ্যালারের মন্তব্য। যত দিন যাচ্ছে মন্তব্যটি ততই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কারণ, পরিবেশ নিয়ে আমাদের যে বোধ তা বারবার ভ্রান্ত প্রমাণ হচ্ছে। হয়তো পরিবেশের জন্য একটি অতি প্রয়োজনীয় মহিরুহকে কেটে ফেলা হচ্ছে আবার যে গাছ পরিবেশে মিথেন ছড়িয়ে দিচ্ছে তা রয়ে গেছে হাজারে-বিজারে। বছর দশেক আগেও ভাবা হতো সমস্ত বৃক্ষই পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে সর্বরোগহর ওষুধ। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। বেশ কিছু বৃক্ষ আছে, যা কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণের সঙ্গে মিথেনও ছড়ায়। গ্রিন হাউস গ্যাসের উত্স ও বিনাশ স্থল গবেষণায় যা প্রমাণ হয়েছে। লাখ লাখ বৃক্ষ রোপণের পরিকল্পনা করা হয়, রোপণও হয় নিশ্চয়ই। কিন্তু সে ক্ষেত্রে বাতাসে মিথেন ছড়ানো বৃক্ষগুলোকে বিবেচনায় আনা হয় কি না জানিনা। তবে বাতাসে মিথেনের পরিমাণ যে ক্রমেই বেড়ে চলেছে, এ তো গবেষণায় প্রমাণিত সত্য।
বৃক্ষ গেল, অরণ্যের কথা বলি। ১৮৬৫ সালের আগে পর্যন্ত অরণ্য আইন বলে কিছু ছিল না। ১৮৭৮ সালে প্রথম উইলিয়াম উইলসন হান্টার সুন্দরবনকে সংরক্ষিত অরণ্য হিসেবে ঘোষণা করেন। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, সুন্দরবনের প্রত্যক্ষ অধিবাসীদের জবানবন্দি এমনকি সরকারি নথিপত্র থেকেও মাঝে মাঝে উঠে আসে সুন্দরবনে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বনবিনাশী কর্মকাণ্ড। সমুদ্র সৈকত, ম্যানগ্রোভ বন এমনকি হিমালয় পর্যন্ত মানুষের কারণে ঝুঁকির মধ্যে আছে। অবশ্য ঢালাও সব মানুষের জন্য এ মন্তব্য প্রযোজ্য নয়। একই সঙ্গে আমরা দুটি দৃশ্য দেখি। একদল প্রতিদিন হাজার হাজার প্লাস্টিক পণ্য, ক্যান ফেলে সমুদ্রকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন আরেক দল স্বেচ্ছাশ্রমে তা পরিষ্কার করছেন। যারা স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন তারা যে সমুদ্র বিষয়ক একাডেমিক তত্ত্বকথা খুব জানেন তা নয়। এই কাজটি তারা করেন সমুদ্রকে ভালোবেসে। হিমালয় বিষয়ক এক ওয়েব সাইটের তথ্য বলছে, যে পাহাড় শৃঙ্গকে জয় করে অভিযাত্রীরা জয়ের মালা গলায় পড়েন তারাই নাকি আজ পাহাড় দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাহলে কি ধরে নেব যে যত শিক্ষিত সে তত মূর্খ? নইলে শিখর অভিযাত্রীরা কেন হিমালয় দূষণের কারণ হবেন? মানুষ যখন তথাকথিত শিক্ষিত হয়ে ওঠেনি তখন হিমালয় অরণ্য সমুদ্র সবাই ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পেরেছে। ট্যুর অপারেটররা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ ট্যুর স্পটগুলো সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে ডিজিটাল বর্জ্য দিয়ে। কারণ প্রকৃতি আমাদের কাছে কেবল দেখার এবং দেখানোর সামগ্রী। মানে একেও পণ্য করে ফেলেছি। যে কোনো প্রাকৃতিক পরিবেশে যেভাবে সেলফির হিড়িক দেখি তাতে এই তথ্য অবিশ্বাসের কোনো কারণ নেই। মধ্যবিত্ত শ্রেণির গায়ে হলুদ, বিয়ের উত্সবে অগণিত বাজি পোড়ানো হয়, ফানুস ওড়ানো হয় আর লেজার রশ্মি ছাড়া তো উত্সবই অসম্পূর্ণ বলে ভাবা হয়। লেজার রশ্মি ব্যবহারে খরচ হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান বিদ্যুত্। দেখা যায়, বিয়ে বাড়ির এই জমকালো আয়োজনের পাশেই কাগজে আগুন জ্বালিয়ে শীত পোহাচ্ছে আরেক শ্রেণি। অনেক ক্ষতি সরাসরি এবং সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ে না। কিন্তু আমাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান থেকে বুঝতে পারি নগর অঞ্চলে জনঘনত্ব বেশি হওয়ায় বাজির ধোঁয়ায় মিশে থাকা বহু ক্ষতিকর রাসায়নিক বাতাসের সঙ্গে মিশে থাকে। পটকার সাধারণ উপাদান সোডিয়াম নাইট্রেট, কাঠ কয়লা আর গন্ধকের মশলার রঙ সঙ্গে আরো নানান রকম ক্ষতিকর ধাতু, রুপালি ঝলকের জন্য ব্যবহার হওয়া অ্যালুমিনিয়াম, সবুজের জন্য ব্যবহার হওয়া বেরিয়াম, লালের জন্য স্টনশিয়াম প্রত্যেকটি শরীরের জন্য সীমাহীন ক্ষতির কারণ।
সাম্প্রতিক নগর সংস্কৃতিতে বিয়ে উত্সব মানে ডিজে বক্স থেকে উচ্চ স্বরে বাজানো বলিউডি সংগীত। যত উচ্চ স্বর তত আনন্দ। কী এর মনস্তত্ত্ব তা বুঝতে অপারগ আমরা। উত্সবে খাবারের অসীম অপচয়। খেতে না পেরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে যে খাবার তাই আবার ডাস্টবিন থেকে তুলে খাচ্ছে আরেক দল। কেন? উত্সবে বেঁচে যাওয়া খাবার কি প্যাকেট করে সন্মানের সঙ্গে বস্তিতে পৌঁছে দেওয়া যায় না? জানতাম শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্ক থাকে পরিমিতিবোধের। এখন দেখছি ভুল জেনেছি। আনন্দ ছাড়াও উত্সবে পরিমিতিবোধেরও যে একটি সম্পর্ক আছে তা ভুলে যাওয়ার মধ্যেই যেন গৌরব। এই গৌরব বা আত্মশ্লাঘার কারণে এখন যেমন মিনারেল পানি কিনে খাচ্ছি, ভবিষ্যতে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার জন্য তেমনি বোতল ভর্তি অক্সিজেন কিনতে হতে পারে। চাঁদের পর মঙ্গলে পাড়ি দিয়ে অনেক দূর এগিয়েছে মানুষ, এই যা আশার কথা। ভবিষ্যতের মানুষকে মঙ্গলে গিয়েই বাস করতে হবে হয়তো। পৃথিবী বসবাসের উপযোগী থাকার সম্ভাবনা প্রতিদিনই কমিয়ে আনছে মানুষ।
n লেখক :প্রাবন্ধিক ও গবেষক