বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক উত্সব-২০২০

নিজস্ব সংস্কৃতি তুলে ধরার উত্সব

বাঙালি জাতিসত্তার মূল ভিত্তি তাদের নিজস্ব কৃষ্টি। গ্রামীণ জনপদে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এর নানা উপকরণ। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চল কোনো না কোনোভাবে সমৃদ্ধ তার নিজস্বতায়। কোথাও ভাটিয়ালি গান প্রাণে দোলা দেয় নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে আবার কোথাও ভাওয়াইয়া তাড়িয়ে নিয়ে যায় দূর দিগন্তের দিকে। আমাদের গীতিকাগুলো জানান দেয় আমাদের আদি চলন-বলনের। দাদা-দাদি, নানা-নানির কাছে কেচ্ছা-কাহিনি তো সন্ধ্যার নিত্য আবদার ছিল। এই যে বাংলা ও বাঙালির নিজস্বতা, তা দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে কালের স্রোতে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা মকরের মতো আমাদের যে দুইশ বছর গ্রাস করেছিল; তা শুধু অর্থ-সম্পদে নয়, মনন ও মগজেও সেই মকরের দাঁত বসিয়ে দিয়ে গেছে। তাতেই পরবর্তীকালে নির্মিত হয়েছে ব্রিটিশ আদলে নাটক। ক্রমেই আমাদের সংস্কৃতির মধ্যে অণুজীবের মতো প্রবেশ করেছে তাদের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান-আনুষ্ঠানিকতা। আর বাংলাদেশও তাদের সেই কৃষ্টিতে আবৃত হয়েছে কিছুটা। সেই খোলস থেকে বেরিয়ে আসার বাংলাদেশ চেষ্টা করছে বহু বছর ধরে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বছরের পর বছর—প্রায় এক দশকের কাছাকাছি সময় ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ফিরে আসতে। বিভিন্ন সময়ে তারা বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালাকে আবার পুরোনো ঢঙে ফিরিয়ে আনতে নানা কর্মসূচি নিয়েছে এবং কাজ করে যাচ্ছে। এবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করেছে ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক উত্সব-২০২০’। গত ৩ জানুয়ারি শুরু হওয়া আয়োজনটি চলবে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে এ আয়োজন। নানা আয়োজনের পর শেষ সময়ে থাকে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের লোক পালা।

বাংলাদেশ হাজার বছরের বর্ণিল ও বিচিত্র সংস্কৃতির অপরূপ লীলাভূমি। হাজার বছরের সেই ঐতিহ্যকে অবলম্বন করে আজও নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে দেশব্যাপী পরিচালিত হচ্ছে আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞ। লোকজ সংস্কৃতি আমাদের অন্যতম শক্তি, যা বিশ্বব্যাপী আমাদের স্বাতন্ত্র্যকে জানান দেয়। বাঙালি সংস্কৃতির রূপ, নির্মিতি ও পরিবেশনা কৌশল আসলে মিশ্র প্রকৃতির; বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত বিভিন্ন শাসনব্যবস্থা, ভাষা ও প্রকরণের সমন্বয় ঘটিয়ে আমাদের সংস্কৃতি আজকের জায়গায় পৌঁছেছে। ২১ দিনব্যাপী বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক উত্সবের পরিবেশনার মধ্যে রয়েছে সমবেত সংগীত, যন্ত্রসংগীত, ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলা, পালা, একক সংগীত, বাউল সংগীত, ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য, যাত্রা, সমবেত নৃত্য, অ্যাক্রোবেটিক, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পরিবেশনা, পুতুল নাট্য, একক আবৃত্তি, শিশুদের পরিবেশনা, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগীত ও নৃত্য, নাটকের কোরিওগ্রাফি, বৃন্দ আবৃত্তি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের পরিবেশনা, আঞ্চলিক ও জেলা ব্র্যান্ডিং-বিষয়ক সংগীত ও নৃত্য এবং জেলার ঐতিহ্যবাহী ভিডিও চিত্র প্রদর্শনী।

প্রতিদিন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নন্দন মঞ্চ ও বাইরের মাঠ রঙিন হয়ে উঠছে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলর শিল্পীদের নানা পরিবেশনায়। সমাগত দর্শকের ফুরফুরে মন রঞ্জিত হচ্ছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক আবহে।