উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবাসন সংকট

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় নানা অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রহিয়াছে। দীর্ঘদিন ধরিয়াই প্রধান একটি সমস্যা হইল আবাসন সংকট। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান তাহার চরিত্রগত কারণেই সাধারণত আবাসিক হইয়া থাকে। ইহা যেমন প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনই প্রযোজ্য হাল আমলের যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। যদিও বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় রহিয়াছে মাত্র একটি—জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি সম্পূর্ণ আবাসিক হওয়ার কথা থাকিলেও সেইখানেও আবাসন সংকট রহিয়াছে। দেখা যায়, উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হইতে শুরু করিয়া যেইখানেই আবাসনের ব্যবস্থা থাকিবার কথা সেইখানেই থাকে আবাসন সংকট। মূলত আবাসন ব্যবস্থার অনুপাতে শিক্ষার্থী ভর্তি না করিয়া অধিক সংখ্যায় ভর্তি করাই ইহার প্রধান কারণ। 

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৩৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ৩১ হাজার ৬৯০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে আবাসন-সুবিধা রহিয়াছে মাত্র ৮০ হাজার ৩১৪ শিক্ষার্থীর। প্রতিবেদন অনুযায়ী ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই আবাসন-সুবিধা হইতে বঞ্চিত। প্রথমেই ধরা যাউক, দেশের সেরা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। সেইখানকার আবাসন সমস্যা নিয়া আমরা অজস্র সংবাদ প্রকাশিত হইতে দেখিয়াছি। আবাসন সংকট নিরসনে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও আমরা দেখিয়াছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮টি আবাসিক হল ও দুইটি ছাত্রাবাস রহিয়াছে। প্রায় ১৫-২০ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসন ব্যবস্থা হইলেও বাকি অর্ধেক শিক্ষার্থীর জন্য কোনো আবাসনেরব্যবস্থা নাই। প্রতি বত্সর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িলেও বাড়িতেছে না আসনসংখ্যা। ইহার ফলে উদ্ভূত হইয়াছে গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি। বিশেষত প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের গণরুমে রাখিয়া ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন তাহাদেরকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করিয়া থাকে। ইহার প্রভাব পড়িতেছে পড়াশোনা হইতে শুরু করিয়া সামগ্রিক জীবনযাত্রায়। গণরুমগুলিতে আট জনের বিপরীতে থাকিতেছেন অন্তত ২০-৩০ জন। অনেকেই রাত কাটান হলের বারান্দায় ও মসজিদে। ইহাতেও সকল শিক্ষার্থীর আবাসন নিশ্চিত করা যাইতেছে না। বাকিদের থাকিতে হইতেছে হলের বাহিরে। ফলে তাহাদের বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হইতেছে এবং পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ হইতে তাহারা বঞ্চিত হইতেছে। একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হইলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনসংকট তীব্র আকার ধারণ করিয়াছে। সর্বমোট ১৩টি হল থাকিলেও প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা হলে আসন পায় দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষে। আসন পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত গণরুমে থাকিতে হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রদের জন্য ১১টি ও ছাত্রীদের জন্য ছয়টি হল রহিয়াছে। তবে প্রায় দ্বিগুণসংখ্যক শিক্ষার্থী হলগুলিতে অবস্থান করিতেছে।

ইহা কেবল কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট নহে, বরং আবাসন ব্যবস্থা রহিয়াছে—এমন সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিত্র। এই অবস্থা হইতে রাতারাতি উত্তরণ ঘটানো হয়তো সম্ভব নহে। তবে দেশে উচ্চশিক্ষার মান বাড়াইতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির আবাসন সংকট নিরসনের বিকল্প নাই। সরকারকে সঠিক পরিকল্পনা করিয়া সেই পথে হাঁটিতে হইবে।