অব্যাহত ইরান-মার্কিন দ্বন্দ্বে গোটা বিশ্বে উত্তেজনা বিস্তৃত হয়েছে। সংঘাতমুখর মধ্যপ্রাচ্যে এই দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। আরব বিশ্বের এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে নতুন সমীকরণের অনুশীলন চলছে। সম্ভবত স্নায়ুযুদ্ধের পর পৃথিবী এরকম যুদ্ধাবস্থার আর মোকাবিলা করেনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর একক বৈশ্বিক নেতৃত্বে ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বা নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা অনুযায়ী পৃথিবী পরিচালিত হচ্ছিল। মানবজাতি আশা করেছিল, নতুন বিশ্বব্যবস্থার মাধ্যমে যুদ্ধ জাদুঘরে নিক্ষিপ্ত হবে, শান্তি ও সমৃদ্ধির জোয়ার বয়ে যাবে এই গ্রহে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়—শান্তি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে অধিকৃত হচ্ছে স্বাধীন রাষ্ট্র। বিজ্ঞানের আশীর্বাদ ও অবাধ বৈশ্বিক বাণিজ্যের কারণে পৃথিবী যখন সমৃদ্ধির শীর্ষে উপনীত তখন জাতি-রাষ্ট্রসমূহের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা পদদলিত হচ্ছে অনায়াসে এবং অসহায়ভাবে।
২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরপর বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের নতুন চেহারা নগ্নভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। হান্টিংটন কথিত সভ্যতার দ্বন্দ্ব এক রকম নিরাভরণ বা পোশাক-আশাকবিহীন হয়ে ওঠে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শাসনকালের সূচনাতেই। ভদ্রতার আবরণে ও সংস্কৃতির পোশাকে যে ঘৃণার মনোভাবটি এতকাল ছিল সুপ্ত বা অপ্রকাশ্য তা নতুন করে সারা পৃথিবীময় এক নতুন ঝড় সৃষ্টি করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন সন্ত্রাসের জন্য মুসলমানদের দায়ী করেন, প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারে ছয়টি দেশের মুসলমানদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন, তখন তাদের মৌলিক মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। এই প্রথমবারের মতো কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফিলিস্তিনি সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে একক রাষ্ট্রের তথা একমাত্র ইসরাইলের স্থিতির লক্ষ্যে প্রকাশ্য ঘোষণা প্রদান করেন। ট্রাম্প ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের গৃহীত প্রস্তাবনা অনুযায়ী ইহুদি ও মুসলমানদের জন্য দুটো পৃথক পৃথক রাষ্ট্রের ঘোষণাকে নাকচ করেন। অনেকদিন ধরে ইসরাইল জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা করে আসছিল। জেরুজালেম যেহেতু খ্রিষ্টান, ইহুদি ও মুসলমান—এই তিন ধর্মের পবিত্র ভূমি সেহেতু তার স্বাতন্ত্র্যের প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন ছিল। চরম তোষণনীতি অবলম্বন করার পরও কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরুজালেমে ইসরাইলের রাজধানী স্থানান্তর সমর্থন করেননি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার কূটনীতি, অর্থনীতি ও সমরনীতি দ্বারা আরব-বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রকে ইসরাইলের বশীভূতকরণের প্রচেষ্টা চালায়। বিশেষ করে ট্রাম্পের জামাতা কুশনার এবং নতুন সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান আরব বিশ্বে তাদের নগ্ন হস্তক্ষেপের প্রমাণ রাখেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত এই অপকৌশলের অংশীদার হয়ে ওঠে। মিশর, জর্দান ও ওমানের মতো রাষ্ট্রসমূহ ইতিমধ্যেই মার্কিন পরিকল্পনাকে অনুমোদন করে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তি ইরান পাশ্চাত্য তথা ইসরাইলের প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়। এদিকে ইরানও তার প্রভাবলয় বিস্তারের পরিকল্পনা অটুট রাখে। প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রসমূহের চতুর্দিকে তারা সশস্ত্র সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করে। এভাবে তৈরি হয় গাজায় হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী, সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ। এই বিভাজনের আর একটি দিক হলো—ইসলামের চিরায়ত দ্বান্দ্বিক গোষ্ঠী-শিয়া ও সুন্নি বিরোধকে কাজে লাগানো। সৌদিরা সুন্নিদের অভিভাবকত্বের দাবি করে। অপরদিকে শিয়াদের অধিকাংশের ওপরই ইরান নিয়ন্ত্রণ রাখে। সম্প্রদায়গত বিরোধ প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক তথা সাংঘর্ষিক বিরোধে রূপ নিচ্ছে।
শিয়া ও সুন্নি বিরোধের উত্তম ক্ষেত্র হচ্ছে ইরাক। ইরানের পরে ইরাক হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে শিয়া অধ্যুষিত দেশ। ধর্মীয়ভাবে দেখলে ইরাক তিনভাবে বিভক্ত। ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক দখল করে নিলে তারা এই বিরোধকে তাদের স্বার্থে স্থায়ী রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। মার্কিনিরা কার্যত ইরাকে তিন ভাগে বিভক্ত করে—শিয়া অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চল, উত্তরের কুর্দি এলাকা এবং দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা সুন্নি জনগোষ্ঠী। সাদ্দামের লৌহ কঠোর শাসনে ও নির্মমতায় এই গোষ্ঠীগুলির বিরোধ প্রকাশ্য রূপ ধারণ করেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্থানীয় তাঁবেদারদের হাতে ইরাকের শাসনভাগ তুলে দেওয়ার পর আজ পর্যন্ত সেখানে এই ত্রিমুখী সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। সেখানে একটি কেন্দ্রীয় সরকার রয়েছে বটে, শাসনক্ষমতা মূলত ঐ তিন শক্তির কাছেই নিহিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উপর্যুপরি ইরাককেন্দ্রিক হামলা দেশটির সার্বভৌমত্বকেই বিপর্যস্ত করে তুলেছে। একবিংশ শতাব্দীর এই প্রান্তে যেখানে সব রাষ্ট্রের সমান অধিকার ও আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ অধিকতরভাবে অনুসৃত হচ্ছে সেখানে ইরাকি সরকারের কোনো রকম অনুমতি, অনুমোদন এমনকি তাদেরকে না জানিয়ে দুটো রাষ্ট্র যেভাবে ইরাকের স্বাধীন অস্তিত্বকে একরকম অস্বীকার করেছে তা সমসাময়িক পৃথিবীতে বিরল। এই সেদিন ইরানের রিপাবলিকান গার্ডসের ‘কুদস বাহিনী’র প্রধান মেজর জেনারেল কাসেম সোলেইমানি বাগদাদ বিমানবন্দরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মৃত্যুবরণ করেন। প্রথম মহাযুদ্ধের সূচনায় এরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল। অস্ট্রিয়ার যুবরাজ ফার্দিন্যান্ড বসনিয়ার রাজধানী সারাজেভোতে রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে নিহত হন। এই ঘটনার সঙ্গে সেই ঘটনার পার্থক্য এই যে, যুবরাজ ফার্দিন্যান্ড আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। আর এখানে জেনারেল কাসেম সোলেইমানি অতি পরিকল্পিতভাবে সরাসরি সরকারি নির্দেশে নিহত হলেন। এই নগ্ন ও নির্মম ঘটনার পর ট্রাম্প গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করেছেন—তিনিই এই মৃত্যুর আদেশ দিয়েছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হলে বা ষড়যন্ত্রের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হলে তা নিয়ে বিরোধ এবং ঘোরপ্যাঁচ সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু যেখানে খোদ রাষ্ট্রপ্রধান হত্যার আদেশ দিয়েছেন—তা কীভাবে বিবেচ্য হবে? মার্কিন মিত্রসহ সারা পৃথিবীর বিবেকবান মানুষেরা ধিক্কার দিয়েছে এই হত্যার প্রতি। ট্রাম্পের নিজ দেশে নিন্দার ঝড় উঠেছে। এরকম আন্তর্জাতিক আইনকানুন লঙ্ঘন করে প্রকাশ্যে হত্যার কারণে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনা ক্ষমতা খর্ব করার পক্ষে প্রস্তাব পাশ করেছে। যদিও সিনেট বা উচ্চ পরিষদে এই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তার কারণ, সিনেটে তার নিজ দলের প্রাধান্য রয়েছে। এই হত্যার প্রতিবাদে চরম প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেয় ইরান। তারা ইরাকে অবস্থিত দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইরান দাবি করে এই হামলায় ৮০ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। অপরদিকে হোয়াইট হাউজ কোনো রকম ক্ষয়ক্ষতির কথা অস্বীকার করেছে। এ কথা সত্য যে, ইরানের সামরিক প্রতিশোধ নেয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক দখল করেছে এবং ইরাকি সরকারের অগোচরে প্রকাশ্যে বিমান বন্দরে হামলা চালিয়েছে- একই ধরনের অপরাধ বা নগ্ন হস্তক্ষেপ যদি ইরান করে তাহলে তা সে দেশের সার্বভৌমত্ববিরোধী বিষয় বলে বিবেচিত হতে বাধ্য। আগেই বলা হয়েছে যে, ইরাক এখন কার্যত তিন ভাগে বিভক্ত রয়েছে। শিয়া অংশ ইরানের সমর্থনে বিক্ষোভ করেছে। সুন্নি অংশ ইরানের বিরুদ্ধে মিছিল করেছে। আর কুর্দিরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একান্তই অনুগত। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ইরাক নামের স্বাধীন দেশটি দুই পক্ষের শক্তি পরীক্ষার লক্ষ্যস্থলে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশে প্রচলিত প্রবাদবাক্য ‘বাঘে মোষে লড়াই করে, উলুখাগড়া পড়ে মরে’ কথাটি এখানে সর্বাংশে সত্য। তবে ইরাকের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মনে করে তাদের দুর্যোগ-দুর্ভোগের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দায়ী। কাসেম সোলেইমানি হত্যার পর সে দেশের পার্লামেন্ট মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে সর্বসম্মত প্রস্তাব পাশ করেছে। ইতিপূর্বে ইরাকে যে গণবিক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল, তা সার্বজনীন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল। এখন সে ঐক্যে ফাটল ধরেছে। গণ-আন্দোলনের ফলে সরকারের পতন হয়েছিল। একটি গ্রহণযোগ্য সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলছিল।
ইরাক হাজার হাজার বছর আগের সভ্যতার উত্তরাধিকার। প্রাচীন আসিরীয় সভ্যতা এখানেই গড়ে উঠেছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পর এই এলাকাকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়েছিল স্বর্ণযুগ। আধুনিক বিশ্বে ইরাক অবশ্য সেই সভ্যতার উত্তরাধিকার প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছে। এটি হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম ‘অস্থির’ দেশ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষরা মনে করেন, ইরাকে ইরানের হামলা ও শিয়া জনগোষ্ঠীর প্রাধান্যের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না। বরং শিগগিরই হয়তো আরো সৈন্য প্রেরণ করবে। এরই মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে, নামে ও বেনামে সেখানে যথেষ্ট মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। ইরাকে মার্কিন পদাতিক সেনা সংখ্যা ৫ হাজার। আরো রয়েছে পাঁচটি বিমান ঘাঁটি। বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসটিও যেন বিশাল দুর্গ। দূতাবাসে ব্যাপক সামরিক সরঞ্জাম ও সামরিক লোকজন রয়েছে। যা হোক, ইরাক শিগগিরই তার দুর্ভাগ্য থেকে মুক্তি পাবে—এমন মনে হয় না। হরিণ যেমন নিজ মাংসের কারণে হত্যার শিকার হয়, ইরাক তার বিপুল খনিজ সম্পদ বিশেষত তেলের জন্য লক্ষ্যবস্তু। তেল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরাকে রয়েছে পৃথিবীর তেল সম্পদের এক বড় অংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের তেল সম্পদের ওপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব ভোগ করছে। নামকাওয়াস্তে ইরাকের মালিকানা স্বীকার করে তারা তেল উত্পাদন ও বিপণন প্রকারান্তরে নিয়ন্ত্রণ করছে। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ এরিক মারগলিস মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করার কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর ওপর তার নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব। ডলারের প্রাধান্য বজায় থাকার অন্যতম কারণও মধ্যপ্রাচ্যের তেল। তেলের প্রাধান্য নিরঙ্কুশ করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করছে।
n লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়