সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের খবরের শিরোনাম ‘শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় লিখছে ফেসবুকের ভাষা’। মাল্টায় সেকেন্ডারি এডুকেশন সার্টিফিকেট পরীক্ষায় তরুণ শিক্ষার্থীদের নম্বর কম পাওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও ইন্টারনেটের প্রভাবকে দোষারোপ করেছেন পরীক্ষকরা। দেশটির বার্ষিক প্রতিবেদনে ২০১৯ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩ হাজার ৮৮৫ জনের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করা হয়। দেশটির বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফেসবুকের কারণে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতায় বানানে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। তারা প্রকৃত বানান না লিখে ফেসবুকে ব্যবহূত শব্দের বানান পরীক্ষার খাতায় লিখছে। সবচেয়ে বেশি ভুল করেছে রচনা বা প্রবন্ধলেখার সময়। শিক্ষার্থীরা ফেসবুক স্ট্যাটাসের মতো গড়সাপটা বর্ণনা লিখে গেছে, যাতে বিরাম চিহ্নের কোনো ব্যবহার নেই। মাল্টা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত একটি দেশ। লোকসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ এবং বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৪৮ হাজার ডলার। দেশটি ধনী দেশের কাতারে। এমন একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইন্টারনেটের কারণে ফলাফল বিপর্যয় দেশটির নীতি নির্ধারকদের উদ্বিগ্ন করেছে। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ায় প্রযুক্তির ছোঁয়া ধনী দেশগুলোতেই প্রথমে লাগে; তারপর এর ঢেউ এসে লাগে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে।
আমরাও কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে ভালো দিকে এগোচ্ছি না। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক ব্যবহার আমাদের জীবনকে করে তুলছে হতাশাগ্রস্ত, অস্থির ও শিক্ষাক্ষেত্রে কমছে প্রত্যয়ী শিক্ষার্থীর সংখ্যা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইন্টারনেটে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজের অজান্তেই বাড়ছে ধৈর্যহীনতা, ফলে কমছে কোনো কিছু হূদয়াঙ্গম করার ক্ষমতা। কোনো বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে হলে সেই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে চিন্তা করতে হয়। কিন্তু সেটি করার সময় পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা। ফলে গবেষণা মনস্ক জাতি গঠন একটি কঠিন কাজ হয়ে পড়েছে। ২৪ ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুল, সংক্ষিপ্ত শব্দ ও বিকৃত বাক্য দ্বারা ভাবের আদান-প্রদান; দাঁড়ি, কমাবিহীন বাক্য ব্যবহার মনের গভীরে এমনভাবে গেঁথে যাচ্ছে যে, এগুলোকেই সঠিক মনে করছে শিক্ষার্থীরা। ফলে বাস্তব জীবনে শ্রেণিকক্ষে ও পরীক্ষায় কিছুতেই সঠিকতা উপস্থাপন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। এত ভুলের ভিড়ে শিক্ষক সবাইকে মূল্যায়ন করার সময় যদি কঠোর হন, তাহলে দেখা যাবে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী কম নম্বর পাচ্ছে। এমতাবস্থায় শিক্ষককে নিজের চাকরি বাঁচাতে এবং ছাত্রছাত্রীদের রোষানল থেকে বাঁচতে ভুল বিষয়েই নম্বর দিতে হচ্ছে। বিষয়টি জীবের খাদ্যশৃঙ্খলের মতো ভুলের একটি শৃঙ্খল তৈরি করেছে যা মোটেও বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য মঙ্গলজনক নয়।
সম্প্রতি একটি ঘটনা আমাকে ভীষণভাবে বিস্মিত করেছে। কোনো একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ভর্তি পরীক্ষার ৫০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী শূন্য বা শূন্যের কাছাকাছি নম্বর পেয়েছে। মাস্টার্সে ভর্তির প্রশ্নপত্র ছিল বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত। আমার দৃষ্টিতে একেবারে শূন্য পাওয়া খুবই বিষ্ময়ের ব্যাপার। তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রযুক্তিক্ষেত্রে অবদান রাখতে যে ধরনের জ্ঞানার্জন দরকার তা আমরা অর্জন করতে পারছি কি না—এ বিষয়ে আরো ভাবতে হবে। বছরে প্রায় ৩০ হাজার গ্র্যাজুয়েট তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু কোনো আন্তর্জাতিক ভালো মানের সফটওয়্যার কোম্পানি ২০০ প্রোগ্রামার খুঁজলে সেই কোটা তারা পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। সিলেবাস বিশ্বমানেরই রয়েছে। কিন্তু যেখানে সমস্যা তা হলো সিলেবাসের বিষয়বস্তু শেখানো ও ব্যবহারিক ক্লাসে পারদর্শী করার বিষয়গুলোতে ফাঁক থেকে যাচ্ছে। ছাত্রাবস্থায় যে বিষয়টি শেখানো সবচেয়ে জরুরি তা হলো কোনো অজানা বিষয় পড়ে অনুধাবন করে সে বিষয়ে জ্ঞানার্জনের ক্ষমতা অর্জন করা। কিন্তু উদ্যমের অভাব, অনীহা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর সময় দেওয়ার কারণে সে বিষয়ে থেকে যাচ্ছে দুর্বলতা। আমরা পিছিয়ে পড়ছি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে।
ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও আদব-কায়দা এমনভাবে তিরোহিত হচ্ছে যে, শিক্ষকদের শিক্ষকতা পেশায় টিকে থাকাই একটি কঠিন কাজ হয়ে পড়েছে। আমার ছেলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। স্কুল থেকে কোচিংয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত দিল। আমি কোচিংয়ে পাঠালাম। তিন দিন গিয়েই ছেলে আর যেতে চায় না, বলে ‘বাবা ঐ সময়টা বাসায় পড়ি ওখানে প্রচুর হৈচৈ হয়’। আমি সত্যতা যাচাইয়ের জন্য গিয়ে দেখি সত্যিই ছেলেরা মাছের বাজার বসিয়েছে। শিক্ষক অসহায়ভাবে তাদের কথা বলা থামানো থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু কাজ হচ্ছে না। বর্তমানে ছাত্রদেরকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার কোনো ব্যবস্থা শিক্ষকদের হাতে আর নেই।
মনোজগতের সঠিক বোধই মানুষকে পৃথিবীতে সফলকাম হতে সাহায্য করে। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমরা সবকিছুই অতি সহজে বিনা পরিশ্রমে পেয়ে যাচ্ছি। তাছাড়া প্রযুক্তির কল্যাণে নিজেদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগও এক নিমিষেই করতে পারছি। ফলে কোনো প্রাপ্তির পেছনে যে পরিশ্রম আছে, তা আমরা ভুলতেই বসেছি। আমরা ভাবছি, প্রত্যেকটি বিষয়ই হয়তো এমন সহজে পাওয়া যায়। কিন্তু একটু বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায়, মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। যন্ত্র যা এক নিমেষেই করতে পারে, তা মানুষের জন্য এক নিমেষেই করতে পারাটা কল্পনার বিষয়। প্রযুক্তির কল্যাণে যে কোনো কিছুর অতি সহজ প্রাপ্তি আমাদের মনোজগতের নেতিবাচক পরিবর্তন সাধন করছে। আমরা ধৈর্য হারাচ্ছি। কোনো কিছু পেতে একটু দেরি হলেই আমরা অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছি। অসহিষ্ণুতার কারণে আমরা বারবার আমাদের জীবনের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছি। হয়ে পড়ছি হতাশ ও অসফল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইউটিউবের বদৌলতে ২৪ ঘণ্টাই জীবনের আনন্দের অনুষঙ্গ মানুষের হাতে এসেছে। প্রাপ্ত বয়ষ্ক মানুষের কাছে এর ভালো মন্দের দিকগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা থাকলেও তরুণ ও কিশোর জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই বিষয়ে রয়েছে মারাত্মক আকর্ষণ ও মোহ। তাদের কোনোভাবেই এগুলোর কুপ্রভাব থেকে সরিয়ে আনা যাচ্ছে না। স্বীকার করি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইউটিউবে ইতিবাচক কিছু দিক রয়েছে। কিন্তু তরুণ ও যুব সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাবই বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সময় থাকতে সঠিক পথে না এগুলে নিঃসন্দেহে হতাশাজনক ভবিষ্যত্ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
সফল মানুষ মাত্রই ধৈর্য ও সহিষ্ণতার গুণাবলি সম্পন্ন এবং কাজে কর্মে নিপুণ ও পরিপাটি। শিক্ষা ব্যবস্থায় জাতি গঠনের এই গুণাবলীগুলো অক্ষুন্ন রাখতে হবে। অন্যথায় প্রত্যয়ী জাতি গঠনের চেষ্টা অধরাই থেকে যাবে।
n লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০৭