রাশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ সরকার পদত্যাগ করেছে। গতকাল বুধবার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভাষণের পর সরকারের পুরো মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে। তবে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান মন্ত্রিসভাকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। আর মেদভেদেভকে সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপপ্রধান করা হচ্ছে। এদিকে প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনসহ কিছু ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। নতুন সংস্কারের উদ্যোগ উত্তরসূরিকে দুর্বল করবে এবং ২০২৪ সালের পরও পুতিনের আবারও ক্ষমতায় থাকার সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খবর সিএনএন ও রয়টার্সের
প্রেসিডেন্ট পুতিন সরকারের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন। তিনি মন্ত্রিসভাকে তাদের কাজের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে সব কাজ সম্পন্ন হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। প্রেসিডেন্ট পুতিন জানিয়েছেন, তিনি নিকট ভবিষ্যতে মন্ত্রিসভার প্রত্যেক সদস্যের সঙ্গে বৈঠক করবেন। গণহারে পদত্যাগের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী মেদভেদেভও আছেন।
সরকারের আকস্মিক এই পতদ্যাগের ঘোষণা আসে প্রেসিডেন্ট পুতিনের বার্ষিক ভাষণ ও সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়ার পর। তিনি কিছু ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও পার্লামেন্টের হাতে দিতে চান। পার্লামেন্টের হাতে ক্ষমতা দিয়ে মূলত বর্তমান প্রেসিডেন্টের হাতকেই শক্তিশালী করা হচ্ছে। রাশিয়ায় ক্ষমতার এই পরিবর্তনের বিষয়টি অনেক দিন আগে থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল। পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী দিমিত্রি মেদভেদেভকে দেশটির জাতীয় সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপপ্রধান করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নতুন মেয়র হিসেবে মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিনের নাম শোনা যাচ্ছে। উত্তরসূরি দুর্বল এবং পুতিনের জন্য নতুন সুযোগ
সমালোচকেরা বলছেন, ২০২৪ সালের পর ক্ষমতা ধরে রাখতে ৬৭ বছর বয়সি পুতিন বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারেন। একই কাজ পুতিন ২০০৮ সালেও করেছিলেন। তিনি সংবিধানে একই ব্যক্তির দুইবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অনুচ্ছেদ নিষিদ্ধ করেছিলেন। নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পুতিন এমন কিছু করতে যাচ্ছেন, যার মাধ্যমে ২০২৪ সালে মেয়াদ শেষের পর তার আরো ক্ষমতায় থাকার দরজা খুলে যাবে। আর পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নামমাত্র ক্ষমতার অধিকারী হবেন।
বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী মেদভেদেভ এক বিবৃতিতে ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নের জন্যই তার সরকার পদত্যাগ করেছে। রাশিয়ার টেলিভিশনে প্রচার করা মেদভেদেভের বিবৃতিতে বলা হয়, সংবিধানে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনতে চান প্রেসিডেন্ট পুতিন। কেবল কিছু অনুচ্ছেদে পরিবর্তন নয়, ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে চান প্রেসিডেন্ট। মেদভেদেভ আরো বলেন, ‘যেহেতু প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হয়, সেহেতু তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুযোগ দিতে সংবিধানের ১১৭ আর্টিক্যাল অনুযায়ী আমাদের পদত্যাগ করাই শ্রেয়।’ এ সময় প্রেসিডেন্ট পুতিন তার পাশে বসা ছিলেন। মেদভেদেভ সরকারের পদত্যাগে দেশটির শেয়ারবাজারে দরপতন হয়।
পুতিনের ভাষণ ও সংস্কার প্রস্তাব
গতকাল প্রেসিডেন্ট পুতিন ফেডারেল অ্যাসেম্বলিতে দেওয়া বার্ষিক ভাষণে বলেন, কারোরই পরপর দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট থাকা উচিত নয়। তিনি সংবিধানে বিভিন্ন সংস্কার আনারও ঘোষণা দেন। তার মূল প্রস্তাব হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্য নির্বাচনের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাত থেকে পার্লামেন্টের হাতে দেওয়া। তিনি বলেন, ‘আমি জানি আমাদের সমাজে একই ব্যক্তির দুইবার প্রেসিডেন্ট পদে থাকা নিয়ে আলোচনা হয়। এটা মৌলিক কোনো বিষয় নয়। তার পরও আমি মানুষের এই ধারণার সঙ্গে একমত।’ পুতিন প্রস্তাব দেন, প্রথমে পার্লামেন্ট প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীকে অনুমোদন দেবে, এরপর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে উপপ্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নিয়োগ দেবে। প্রেসিডেন্ট তাদের নিয়োগ দিতে বাধ্য থাকবেন। পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন না। পুতিন বলেন, সংস্কার হলে পার্লামেন্ট ও পার্লামেন্টারি পার্টির ক্ষমতা এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, সরকারপ্রধানের নিয়োগে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ থেকে অনুমোদন নিতে হয় প্রেসিডেন্টকে। এরপর প্রেসিডেন্ট সব উপপ্রধানমন্ত্রী ও অন্য মন্ত্রিদের নিয়োগ দেন।