বাঘে কেন মানুষ খায়?

দুষ্টু মিষ্টি অনিক। বয়স আর কত? খুব বেশি হলে পাঁচ কি সাড়ে পাঁচ বছর। হঠাত্ই তার বন্ধুত্ব হয় এক বাঘের সাথে। যেন তেন বাঘ নয়, একেবারে যাকে বলে মোটা কেঁদো বাঘ। গায়ে তার ডোরাকাটা আছে, জ্বলজ্বলে চোখ, মুখভর্তি দাড়ি, থুক্কু গোঁফ আছে। বাঘ তো বিড়ালের বোনের ছেলে, গোঁফ তাই থাকবেই। কিন্তু কথা হলো এই, বিড়াল তো কখনো মানুষের মাংস খায় না, ছুঁয়েও দেখে না, বাঘ তাহলে খায় কেন?

লাখ টাকার প্রশ্ন বটে। এই নিয়ে বাঘের সাথে অনিকের ধুন্ধুমার তক্কো বেঁধে যায়। বাঘ কিছুতেই নিজের দোষ স্বীকার করবে না। অকারণ মানুষ মারা যে মোটেও ঠিক কাজ নয়, এটাই যেন মানতে চায় না মোটা কেঁদো বাঘ।

অনিক বলল, ঠিকঠাক বলো তো বাপু, তুমি মানুষ কেন খাও?

বাঘ এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ায়, জিভ দিয়ে গাল চাটে, উল্টাপাল্টা বকে, কিন্তু অনিকের কথার কোনো জবাব নেই তার কাছে।

কী হলো বুড়ো মামা বুনোবাঘ, আমার কথার জবাব দাও। নইলে কিন্তু আমি পশুরাজ সিংহের কাছে গিয়ে বিচার দেবো। অনিক কপট রাগ দেখিয়ে বলল।

তাতে হেসেই বাঁচে না ব্যাটা নচ্ছার বাঘ। 

হাসছো যে বড়ো? আমি ভুল কী বললাম! অবাক হয় অনিক।

হাসবো না তো কাঁদবো নাকি! তুমি যার কাছে বিচার নিয়ে যাবে, সেও তো দিব্যি নরখেকো। সিংহ কি ভেবেছো মানুষ মেরে খায় না! নাকি মানুষ দেখলে সে গড় হয়ে প্রণাম করে!

অনিক ভাবে আর মাথা চুলকায়। আরে তা-ই তো, বাঘ তো কিছু ভুল বলেনি! চোরের কাছে তো আর চুরির মামলা নিয়ে যাওয়া যায় না। চাই কি, রেগেমেগে ব্যাটা সিংহ অনিককেই না আবার নুন-মরিচ ছাড়া চিবিয়ে খায়! না বাবা, না, এ কাজ করা যাবে না। তারচে বরং ওর বাঘবন্ধুই ভালো। নরখেকো বটে, তবে সে অনিককে বেশ আদর করে। শুঁকেটুকে ছেড়ে দেয়। ভুলেও লোভ করে না।  

সে যাক, অনিক খুব মন খারাপ করে বসে থাকে। কিছুতেই সে ভেবে পায় না, বনে এত এত প্রাণী থাকতে বাঘে মানুষ কেন খাবে! মানুষ তো ওদের কোনো ক্ষতি করেনি।

উঁহু! একটা ক্ষতি অবশ্য করেছে বটে। মানুষ বাঘের থাকার জায়গা নষ্ট করেছে। বন কেটে উজাড় করছে। এটা অবশ্য বাঘের রাগের একটা কারণ হতে পারে। কিন্তু তাই বলে কাঁচা খেয়ে ফেলবে! কোনোরকম বাছবিচার করবে না!

কেঁদো বাঘ বোঝে, অনিক তার ওপর রাগ করেছে। নাকি অভিমান! বন্ধুর মান ভাঙানোর জন্যে বাঘ শেষে বলল, শুনবে নাকি আমরা কেন মানুষ দিয়ে ডিনার করি! এসো, তবে শোনো, বাঘে কেন মানুষ খায়!

খুশি হয় অনিক। সে বাঘের গা ঘেঁষে বসে। বলো, এই আমি শুনছি।

সে অনেক কাল আগের কথা। আমার ঠাকুরদার বাবার আমলের হবে হয়তো। এ তল্লাটে ভীষণ অত্যাচারী এক রাজা বাস করতো। তার কাজই ছিল বন-বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে নানান রকম বন্যপ্রাণী শিকার করা। একদিন কী হলো, রাজা দূর থেকে একটা বাচ্চা বাঘকে লক্ষ করে গুলি ছুড়লো। গুলি লাগলো বাঘের ঠ্যাঙে। বাঘ মরলো না, কিন্তু চিরদিনের জন্যে সে খোঁড়া হয়ে গেল।

তারপর! তারপর কী হলো বন্ধু? খুব উত্সাহ বোধ করে অনিক। বাঘের মুখে গল্প। বোঝো ঠেলা!

তারপর আর কি! বেচারা বাঘ আর শিকার ধরতে পারে না। খোঁড়া ঠ্যাঙ নিয়ে কি আর দ্রুত ছোটা যায়! হরিণরা সব তাকে দেখলে হাসে, ঠাট্টা-তামাশা করে। বাঘের মা-বাবা এতে খুব কষ্ট পায়। ভীষণ রেগে যায়। সে এক ফরমান জারি করে যে, মানুষরা তাদের দুশমন। এখন থেকে শুধু হরিণ বা গরু-ভেড়া মোষ নয়, তোমরা সকলে ইচ্ছেমতো মানুষ ধরে খাও। ওরা ঠিকমতো শিকারও করতে জানে না। বাঘ মারার মুরোদ নেই, গুলি করে মিছে কষ্ট দেওয়া! তুমিই বলো ভাই অনিক, আহত বাঘ শিকার ধরবে কী করে! ও কি ছুটতে পারে? গুলি যখন করলেই, একেবারে মেরে ফেললে না কেন! তাতে তার জ্বালা জুড়াতো। অনিক ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখল, ভুল কিছু বলেনি তার বাঘবন্ধু। একেবারে মেরে ফেললে তাতে কষ্টের কিছু থাকে না। কিন্তু আহত করলে তাকে না খেয়ে মরতে হয়। বাঘের মানে লাগে। আর বাঘের জন্যে সবচে সহজ শিকার হলো গিয়ে মানুষ। আর তারপর থেকে বাঘে মানুষ খেতে শুরু করে।