কবি ও কথাসাহিত্যিক মুস্তাফিজ শফি তার সাংবাদিক পরিচয়ের আড়ালে অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছেন। অথচ প্রায় তিন দশক থেকে তিনি সাহিত্যচর্চা করছেন। শুরু করেছিলেন কবিতা দিয়ে—এবং শুরুর কয়েকটি কবিতা পড়ে আমার মনে হয়েছিল এক সম্ভাবনাময় কবির যেন আত্মপ্রকাশ ঘটল। ভাষার ওপর তার চমত্কার দখল, উপমা-উেপ্রক্ষার অনুপম ব্যবহার, শব্দে শব্দে নিটোল ছবি আঁকার তার ক্ষমতা আমাকে আশাবাদী করেছিল। অনেকদিন পর ‘বিরহসমগ্র’-তে (২০১৯) সংকলিত কবিতাগুলি পড়তে গিয়ে মনে হলো, মুস্তাফিজ তার শক্তির জায়গাগুলি ঠিকই ধরে রেখেছেন, এবং বিষয়চিন্তা, শৈলী এবং প্রকাশকৌশলের ক্ষেত্রে অনেক এগিয়েছেন। ‘ব্যক্তিগত রোদ’ নামের কবিতার দু’টি পঙিক্ত :
ওপারে পুড়ছো তুমি, এপারে আমার ঘর,
মাঝখানে অন্ধকার, শব্দহীন নিভৃত বালুচর।
ছন্দ নিয়ে মুস্তাফিজের দুর্বলতা নেই। এমনকি মুক্তছন্দের, দীর্ঘ চরণের কবিতাতেও তার রয়েছে সমান দক্ষতা এবং অধিকার—
পুরনো ঢেউয়ের শব্দ শুনতে কি পাও তুমি — ছায়াচ্ছন্ন দুপুরে, দূরে
বহুদূরে কুয়াশার মতো বিভ্রম রেখার ওপারে?
‘বিরহসমগ্র’ পড়তে পড়তে মনে হলো, এই কবির তো অনেক আলোচনার কেন্দ্রে থাকার কথা। কিন্তু নেই। অবশ্য নেই অনেক ভালো কবি, অনেক তরুণ প্রতিভার।
এ নিয়ে আক্ষেপ করে অবশ্য লাভ নেই।
মুস্তাফিজ শফির কবিতা যখন প্রথম পড়ি, একটি বিষয় আমাকে আকৃষ্ট করেছিল এবং তা তার কবিতার বয়ানধর্মিতা, কবিতার পর কবিতায় তিনি গল্প বলে গেছেন, গল্প বলার মেজাজটা তৈরি করেই, পাঠককে বরং গল্পের সুতোগুলি খুঁজে নেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে। আমার মনে হয়েছিল এই কবি একজন গল্পকারও। এবং ‘পড় তোমার প্রেমিকার নামে’ অথবা ‘কবির বিষণ্ন বান্ধবীরা’ (শিরোনামে মুস্তাফিজ তার ওপর গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের প্রভাবের একটা প্রতিফলন ঘটিয়েছেন) পড়ে যখন এই ধারণাটা জোরদার হয়েছে, তার কয়েকটি গল্প আমার গোচরে এল, পড়লাম, এবং মনে হলো গল্পকার হিসেবেও তার শক্তি ঈর্ষণীয়। তবে তার খুব বেশি গল্প-উপন্যাস আমার পড়া হয়নি—এটি আমারই অক্ষমতা। ‘জিন্দা লাশ’ অথবা ‘রমেশ ডোম’ (২০১৮) ও এর এক বছর আগে প্রকাশিত ‘ঈশ্বরের সন্তানেরা’ পড়েছি অতি সম্প্রতি। আনন্দের সঙ্গে পড়েছি তার ছোটগল্পের সংকলন ‘মাধবী কিংবা বনলতার শেষ বোঝাপড়া’ (২০১৮)। অনেকদিন ধরে লিখলেও দেখা যাচ্ছে গত পাঁচ-সাত বছরে মুস্তাফিজ একটু গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছেন। আশা করি এরপর তিনি নিয়মিত হবেন।
আমি নিজে ছোটগল্প লিখতে স্বস্তি পাই, কেউ ছোটগল্প লিখলে তার সঙ্গে একটা আত্মিক টান অনুভব করি। মাধবী-র গল্পগুলো সেজন্য অনেকটা সময় নিয়ে পড়লাম। উপন্যাসে মুস্তাফিজ শফির দৃষ্টিটা প্রসারিত থাকে, অনেক দূরে—গভীরে তিনি দৃষ্টি দেন। ছোটল্পে সেই দৃষ্টি তীক্ষ্ম হয়, গল্পরেখাটিও মাঝের বা শেষের কোনো হঠাত্ আলো ফেলা মুহূর্তের দিকে এগিয়ে যায়। উপন্যাসে পাঠক নিশ্বাস ফেলার সময় পান, ছোটগল্পে তাকে মুস্তাফিজ রুদ্ধশ্বাস রাখেন।
মাধবী-র গল্পগুলোকে বলা হচ্ছে ‘জটিল সম্পর্কের গল্প’, কিন্তু সম্পর্কের বাইরেও অনেক বিষয় চলে আসে কবিতাগুলিতে সময় নিয়ে কিছু দার্শনিক অনুধাবন, মানুষের নিঃসঙ্গতা, বিপন্নতা অথবা সমাজ যখন বাধা হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তির অর্জনের পথগুলিতে তখন যে বৈকল্য সৃষ্টি হয় এসবের চমত্কার বর্ণনা থাকে গল্পগুলিতে। হিংসা-প্রতিহিংসা-আত্মপীড়নও অনেক গল্পে গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়েছে, গল্পকার হিসেবে মুস্তাফিজ সফল কিছু অবর্ণনীয় মুহূর্ত সৃষ্টিতে। ‘নীল গল্পের ছেলেটি মেয়েটি’ এরকম মুহূর্ত প্রধান গল্প।
গল্প বলার ছন্দটি মুস্তাফিজের আয়ত্তে থাকে, এজন্য কোনো কোনো গল্প একটি সম্ভাবনার ছবি দিয়ে শুরু হয়, যে সম্ভাবনা সম্পর্ক সৃষ্টি, নিষ্পত্তি অথবা বিচ্যুতির, কিন্তু একবার বর্ণনায় চলে গেলে সেই সম্ভাবনাকে জাগিয়ে রেখেই শেষের দিকে অগ্রসর হন গল্পকার। চরিত্রগুলি তার জীবন্ত, চেনা। নাগরিক জীবনটিও আমাদের যাপিত। কিন্তু গল্প শেষে আমরা একটা ঘোরে চলে যাই, মনে হয়, যেন হঠাত্ একটা অপরিচয়ের ছায়া সব দৃশ্যের ওপর বিছিয়ে গেল।
মুস্তাফিজ শফি পঞ্চাশের দিকে যাচ্ছেন। ২০ জানুয়ারি তার ৪৯তম জন্মদিন। জন্মদিনে তাকে শুভেচ্ছা। একদিন আরো বড়ো পরিসরে তাকে নিয়ে লেখা যাবে।
গল্পকার মুস্তাফিজ থাকুন তার বয়ান নিয়ে, কবি মুস্তাফিজ তার প্রাণিত সুষমা নিয়ে, সাংবাদিক মুস্তাফিজ তার সত্যসন্ধ কলম নিয়ে।