দেশ জুড়ে গণপিটুনির একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়। সন্দেহবশত এই গণপিটুনি বন্ধের উপায় কী? জানতে চাওয়া হয়েছিল পাঠকদের কাছে। ইমেইল ও টেলিফোনে পাঠকের দেওয়া
প্রতিক্রিয়া আজ প্রকাশ করা হলো।
দেশ ও জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মূল মন্ত্র হলো আইন ও আইনের শাসন। আইনের শাসনের কোনো প্রকার ব্যত্যয় ঘটলেই দেশ চরম বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হয়। তারই একটা প্রধান লক্ষণ হলো জনগণ কর্তৃক নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে কথিত অপরাধীকে কোনো প্রকার বাছবিচার না করে গণপিটুনি দেওয়া। এতে অনেক সময় সন্দেহভাজন অপরাধীর করুণ মৃত্যুও ঘটে। আইনের শাসনের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো, আইনের দুর্বলতা নিয়ে হাজারও অপরাধী মুক্তি পেয়ে যাক কিন্তু একজন নিরপরাধ ব্যক্তিও যেন শাস্তি না পায় তা নিশ্চিত করা।
ভুঁইয়া কিসলু বেগমগঞ্জী (মজির)
চৌমুহনী, হাজীপুর, বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ বর্বরদের উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘শিকল পরা ছল রে মোদের শিকল পরা ছল, এই শিকল পরে শিকল তোদের করবরে বিকল।’ সন্দেহবশত গণপিটুনি দেশ জুড়ে সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। সম্প্রতি আমাদের এসব ঘটনাকে হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সন্দেহবশত এই গণপিটুনি বন্ধের উপায় হচ্ছে মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, মানবিক আচরণ শিক্ষা দেওয়া ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক মনোযোগী হওয়া।
রনী
রামচন্দ্রপুর, শৈলকুপা, কুষ্টিয়া
সম্প্রতি গণহত্যা বা গণপিটুনির প্রবণতা বেড়েই চলেছে। হঠাত্ করে এই প্রবণতা কেন বেড়ে গেল—এ বিষয়ে গবেষণা দরকার। আমাদের দেশে স্বাধীনতার পর পিটিয়ে মারার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছিল। এর কারণ ছিল পূর্বশত্রুতা, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং কিছুসংখ্যক অতি উত্সাহী লোকের উত্সাহর ফলে এই জঘন্য কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছিল। বর্তমান ডিজিটাল যুগে ডিজিটাল বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে এসব ঘটনা ঘটে থাকে। এই প্রবণতা রোধ করতে হলে প্রয়োজন সঠিকভাবে আইনশৃঙ্খলা মনিটরিং, ডিজিটাল বিভ্রান্তিকর প্রতিরোধ এবং গণসচেতনতা প্রয়োজন।
মাখরাজ খান
সাঠুরিয়া, মানিকগঞ্জ
মানুষের মানবিক, সৌজন্যবোধ, ভালোবাসা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সহিষ্ণুতা দিনে দিনে কমতে ও হারাতে বসেছে। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা মমত্ববোধ, মানুষ মানুষের জন্য—একথাগুলো মানুষের ভেতর থেকে সরে যেতে বসেছে। উপরোক্ত বিষয়গুলো এখনই আমলে নেওয়া দরকার। মানুষের প্রতি মানুষ শ্রদ্ধা, সহানুভূতি, ভালোবাসা লালন করতে হবে হূদয়ে। তা না হলে আইন, শাসনব্যবস্থা, সামাজিক পরিস্থিতি কোনোটাই কোনো কিছু দিয়ে কাজ হবে না। অবশ্যই নির্যাতন রোধে আইনকে প্রয়োগ করতে হবে যথাযথভাবে।
সুগন্ধী আক্তার
মতিঝিল, ঢাকা
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার হুজুগে বাঙালিকে আরো হুজুগে হয়ে উঠতে সাহায্য করছে। মানুষের মেজাজ-মর্জি এখন এতটাই ‘হট’ হয়ে যাচ্ছে যে তারা মানুষ আর কুকুর বিড়ালে পার্থক্য করতে পারছে না। তাই সবার আগে মানুষের মধ্যে এই মানবিকতাবোধটুকু জাগ্রত হওয়া দরকার যে বিনা বিচারে মানুষকে মেরে ফেলা যায় না। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সময়মত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আরো তত্পর হতে হবে। তাহলে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসবে।
সাদিক-উর-রহিম
ঈশ্বরগঞ্জ, ময়মনসিংহ
মানুষ কি করে এতো নিষ্ঠুর ও এতো পাশবিক হতে পারে? সেটাই আজ প্রশ্ন। মানবিক মূল্যবোধ, সচেতনতা, নৈতিকতা এখন সত্যিকার অর্থেই সবাইকে নাড়া দেয়। মানুষেরই হাতে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে আজ মানবতা। সন্দেহবশত এই গণপিটুনি বন্ধের উপায় হচ্ছে, আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়া ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনেক বেশি হতে হবে তত্পর।
শিশির
পিলখানা, ঢাকা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থাহীনতার কারণেই এ রকম বিচারবহির্ভূত ঘটনা ঘটছে। দীর্ঘ বছর যাবত্ আমাদের দেশের যেমন: ডিআইজি মিজানের ঘটনা, সম্প্রতি এস পি হারুনের ঘটনা। মানুষ এসব কারণে বিশ্বাস করতে পারছে না। তাছাড়া আমাদের দেশে নৈতিকতার চরম অভাব দেখা দিয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা চলছে একটা অনৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে। যার কারণে মানুষ নৈতিকতাসম্পন্ন হতে পারছে না।
যাদের মধ্যে মায়ামমতা কমে গেছে। এছাড়াও আমাদের স্থানীয় শাসনব্যবস্থার ওপরও মানুষের চরম আস্থাহীনতা। যেমন ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান এসব ব্যাপারে ভূমিকা রাখার কথা; কিন্তু তারা নিজেরাই অপরাধকর্মে জড়িয়ে গেছে।
সাইফুল ইসলাম তানভীর
গুলশান, বারিধারা, ঢাকা।
দেশের বিভিন্ন জায়গায়ই গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে এবং বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনিতে মানুষের মৃত্যুর সংবাদ আমরা মিডিয়ায় দেখেছি। এই মানুষই কিন্তু অনেক বড়ো বড়ো ঘটনার সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নীরব দর্শক হয়ে ঘটনা অবলোকন করে। কারো গতিবিধি সন্দেহজনক হলে অথবা কেউ যদি অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে জনসাধারণের কাজ হচ্ছে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সোপর্দ করা। আইন হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ ব্যক্তিবিশেষের নেই। কেউ যেন কোনো গুজব রটাতে না পারে সেদিকেও জোর নজর দিতে হবে। যে কোনো মূল্যে গণপিটুনিতে হত্যা বন্ধ করতে হবে।
মোহাম্মদ শহীদউল্যা
হকভিলা, মেরাদিয়া, সিপাহীবাগ, ঢাকা
দেশ জুুড়ে সন্দেহবশত গণপিটুনির একটা প্রবণতা দেখা যায়। সন্দেহবশত এই গণপিটুনি খুবই মারাত্মক। অনেক সময় এর মাশুল গুনতে হয় নিরীহ মানুষের। তাই সন্দেহবশত এ গণপিটুনি বন্ধ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন প্রথমে জনসচেতনতা তৈরি করা। কারো ওপর সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ কিংবা প্রশাসনকে অবহিত করা। কোনোভাবেই আইনকে নিজের হাতে তুলে না নেওয়া। প্রয়োজনে গণপিটুনির উসকানিদাতাকেও চিহ্নিত করতে হবে। তাহলেই আশা করা যায় এ প্রবণতা বন্ধ হওয়ার।
উবাইদুল্লাহ তারানগরী
দুধনই, ধোবাউড়া, ময়মনসিংহ
একটি সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়তে রাজনৈতিক ভূমিকা অপরিসীম—এ ব্যাপারে রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা জরুরি, অনেক সময় দেখা যায় ‘বাবা-মা’র কথা না শুনলেও নেতার কথা কর্মীরা শুনে বেশি, সে ক্ষেত্রে নেতা কী আচরণ করেন বা করতে বলেন তা বিশ্লেষণ করা দরকার। মাদকের ব্যাপারে শূন্য টলারেন্স থাকতে হবে, মাদকের ব্যাপারে প্রয়োজনে সেনা বাহিনীকে অংশগ্রহণ করানো যেতে পারে, মাদক সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, প্রায় ক্ষেত্রেই মাদকাসক্তরা বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত থাকে। একটি পরিবারের একজন মাদকে আক্রান্ত হলে পরিবারটি ধ্বংস হয়ে যায়, মাদকের সঙ্গে যুক্ত সে যে-ই হোক তার ব্যাপারে কোনো ছাড় নয়।
মো. ফিরোজ আহম্মেদ
মিরপুর সেকশন-৬, ঢাকা
সংবাদপত্রের পাতা খুললেই নিমর্মতার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। নিমর্মতার সংবাদ আছেই। মানুষের মধ্যে ন্যূনতম মানবিকবোধ দিনে দিনে কমেই চলেছে। সর্বশেষ উদাহরণ হলো—গত সোমবার গরু চুরি সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে যশোরের অভয়নগরের তিন জন নিহত হয়েছেন। একই দিনে কুমিল্লার চান্দিনায় এক চা দোকানদারকে হত্যা করে মহাসড়কে লাশ টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কি মর্মান্তিক। মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। এই ধরনের ঘটনাকে প্রতিহত করতে হলে দেশে আইনের শাসন যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠাই হবে একমাত্র পথ। এছাড়া এর কোনো বিকল্প আশা করা যায় না।
মো. খায়রুল ইসলাম (ফুল)
আরাপপুর, ঝিনাইদহ
গুজবের ওপর ভিত্তি করে হোক বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক, গণপিটুনির ঘটনা খুবই দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। অনেকে বলেন, মিথ্যা বলা ও প্রচার করা একটি শিল্প এবং একটি মিথ্যা ১০০ বার প্রচারিত হলে সেটিকে সত্য বলে মনে করা হয়। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব বাতাসের আগে ধাবিত হয়। তাছাড়া, মিথ্যা কল্পকাহিনী গুজব ছড়াতে প্রবল সহযোগিতা করে এবং গুজব কোনো কোনো সময় সমাজে বড়ো ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে গুজবে কান দিয়ে সিংহভাগ মানুষ সত্য-মিথ্যা যাচাই-বাছাই না করে কোনো কোনো সময় যে কোনো ভয়ঙ্কর কাজ করে ফেলতে পারে। গণপিটুনির ঘটনা মূলত এ ধরনের গুজবের নেতিবাচক দিক। আসলে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যে কোনো ধরনের গুজব ছড়ানো ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থি ও গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। গুজব ছড়ানো এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যে দণ্ডনীয় অপরাধ, সে বিষয়েও নাগরিকদের সতর্ক হওয়া খুবই জরুরি।
মো. জিল্লুর রহমান
সতিশ সরকার রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকা
গণপিটুনির ডালপালা মেলছে প্রতিদিনই। দেশ জুড়ে বিভিন্ন এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে ব্যাপকভাবে গণপিটুনির ঘটনা থামছে না বরং তা বেড়েই চলেছে। ইতিমধ্যে অনেকেই আছেন চরম আতঙ্কে। সন্দেহবশত গণপিটুনি বন্ধের ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। যাকে আমরা সন্দেহ করছি, সে আদৌও জড়িত কি না, যাকে সন্দেহ করছি তার পরিচয় কী? তার পরিচয় আগে শনাক্ত হতে হবে। এরপর যদি কিছু মনে হয় তাহলে স্থানীয় থানায় কিংবা র্যাবের কাছে অভিযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। তৃতীয় পক্ষ যেন সুযোগ নিয়ে কোনো অঘটন না ঘটাতে পারে, সেজন্য সব গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করি।
অমিত বণিক
উত্তরা, ঢাকা
কাগজ-কলমে দেশের শিক্ষার হার বাড়ছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ ও চর্চায় আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। তার পরেও এ ধরনের ঘটনা! বলতে দ্বিধা নেই, প্রকৃত শিক্ষার অভাবেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। আর আইনের প্রতি ভরসার জায়গা কমতে থাকলেও এ রকম পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে বলে মনে হয়। অভিযুক্ত বা অপরাধীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দিতে কি ভরসা পাচ্ছে না জনগণ? আসলে জনগণের সেরকম ভরসা অর্জন করতে পেরেছে কি আমাদের আইন-আদালত? সব প্রশ্নের উত্তর ‘না’ হলে, কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। বিভিন্ন ঘটনাচক্রে আলাদা আলাদা প্রেক্ষাপটে জাতির চিন্তা ও মননের দুর্বলতাগুলো ভয়াবহ আকারে প্রকোট হচ্ছে দিন দিন। আশাকরি সংশ্লিষ্ট সবাই বিষয়গুলো নিয়ে ভাববেন এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন—এমনটাই প্রত্যাশিত।
মেনহাজুল ইসলাম তারেক
মুন্সিপাড়া, পার্বতীপুর, দিনাজপুর