জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র ও প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, দেশের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) ও প্রযুক্তি খাতটি খুব দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ায় এই খাতের আয় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গার্মেন্টস খাতের আয়কে ছাড়িয়ে যাবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিআইসিসি হলে তিন দিনব্যাপী ডিজিটাল বাংলাদেশ মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমাদের দেশেও ৫জি প্রযুক্তি চালু হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের এই মেয়াদেই দেশে ফাইভ-জি প্রযুক্তি চালু করা হবে। আমরা আমাদের গত আমলে ফোর-জি শুরু করেছিলাম, তার আগে থ্রি-জি। ফাইভ-জি চালু করতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। প্রযুক্তি বিশ্বে এখন ফাইভ-জি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে জানিয়ে জয় বলেন, ‘আমরা এখন ধরে নিয়েছি, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা ফাইভ-জিতে উন্নীত হব। বাংলাদেশ আর পিছিয়ে থাকবে না। আমরাও ফাইভ-জি প্রযুক্তিতে ভূমিকা রাখতে শুরু করব।’ ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের’ কথা মাথায় রেখে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের ‘জ্ঞানভিত্তিক’ পণ্য ও সেবা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘সরকারি হিসাবে আমরা দেখছি, তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে আমরা প্রতি বছর ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি করছি। তবে অধিকাংশ তথ্যপ্রযুক্তি সেবা-ই যেহেতু ইন্টারনেটভিত্তিক, তাই রপ্তানির মাত্রা বের করা অসম্ভব। তবে আমরা আশা করব, আনঅফিসিয়ালি আরো এক বিলিয়ন বা আরো দুই বিলিয়ন ডলারও রপ্তানি হয়েছে।’
দেশে থ্রি-জি ও ফোর-জি অ্যানাবল স্মার্টফোন না থাকার কারণে ডেটা ব্যবহারের সমস্যা থাকার কথা তুলে ধরেন সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ঐ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করলাম। ভাবতে শুরু করলাম কীভাবে দেশকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। আমরা এই বিষয়টাকে চাপিয়ে দিতে পারতাম না। আমরা ঠিক করলাম, আমরা দেশেই মোবাইল উত্পাদন করে তা কম দামে মানুষের মাঝে দেব, যাতে বাংলাদেশের সব মানুষ মোবাইল ফোন কিনতে পারে। এক সময় আমরা ৩০ মিলিয়ন মোবাইল প্রতি বছর আমদানি করতাম, সেখানে আজকে ২০ মিলিয়ন মোবাইল ফোন বাংলাদেশেই উত্পাদিত হচ্ছে।
মোবাইল ফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্যামসাং এখন বাংলাদেশে তাদের মোবাইল ফোন সংযোজন করছে। স্যামসাংয়ের সে মোবাইল ফোনগুলো ফিলিপিন্সে উত্পাদিত মোবাইল ফোনের চেয়ে ‘ঢের ভালো’ বলে মনে করেন জয়। তিনি বলেন, ‘ফোর-জি চালু করার জন্য আমাদের সে মানের স্মার্টফোন দরকার ছিল। তবে বিদেশে থেকে আনা স্মার্টফোনগুলো ছিল বেশ দামি। ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে গিয়ে স্মার্টফোন উত্পাদনের সব বাধা দূর করেছি। আজকে শুধু বাংলাদেশিদের চাহিদা পূরণের জন্যই আমরা স্মার্টফোন উত্পাদন করছি না। আমরা দেশের বাইরেও স্মার্টফোন রপ্তানি করছি, এমনকি বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ আমেরিকাতেও।’ ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে, তখন থেকেই মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রায় ‘২০ বছর ধরে ফ্রি স্পেকট্রাম’ সেবা দেওয়ায় দেশের প্রায় শতভাগ এলাকা মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে বলে জানান তিনি।
সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘ডেটা কানেক্টিভিটির দিক থেকেও আমরা অনেক পিছিয়ে ছিলাম। ১১ বছর আগে এ দেশে ইন্টারনেটের দাম বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল। ঐ কারণে আমাদের তেমন কোনো প্রযুক্তি খাত ছিল না বলার মতো। আমাদের আওয়ামী লীগ এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। ১১ বছর আগে আমাদের এখানে টু জি কানেক্টিভিটি পাওয়াই যেত না, অধিকাংশ পেতাম ওয়ান জি। আমরা বিশ্বের অন্য সব দেশ থেকে বেশ পিছিয়ে ছিলাম। আমরা ক্ষমতায় আসার পর প্রাইভেট সেক্টরগুলোর সঙ্গে বসলাম। নানা ইনসেনটিভ দিয়ে থ্রি জি স্পেকট্রাম অকশন দিলাম। তারপর পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা ফোর-জিতে উন্নীত হলাম।’
তথ্যপ্রযুক্তি অধিদপ্তর ‘ইনফো সরকার-থ্রি’ প্রকল্পের আওতায় এখন দেশের সবগুলো ইউনিয়নে ফাইবার অপটিক সংযোগ পৌঁছে দিতে কাজ করছে। সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, দেশের সাড়ে চার হাজার ইউনিয়নের মধ্যে সাড়ে তিন হাজার ইউনিয়নে এখন ফাইবার অপটিক সংযোগ পৌঁছে গেছে। তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেট সংযোগ ছিল জটিল একটি ইস্যু। প্রাইভেট সেক্টরের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা, আমরা ফাইবার অপটিক কেবল সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করলাম। এখন আমাদের লক্ষ্য, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সবগুলো গ্রামে অপটিকাল ফাইবার কানেক্টিভিটি পৌঁছে দেওয়া।’
পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল ফোন প্রযুক্তিসহ (ফাইভ-জি) দেশের ডিজিটাল উন্নয়নের নানা দিক তুলে ধরতে প্রথমবারের মতো ডিজিটাল বাংলাদেশ মেলা আয়োজন করেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। উদ্বোধনী পর্বে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকার জন্য ১৪টি শাখায় সম্মাননা দেওয়া হয়। মেলার তিন দিনে বিভিন্ন বিষয়ে ১৩টি আলোচনা সভা হবে, যেখানে সরকারের মন্ত্রী ও দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা অংশ নেবেন। ‘বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার প্রযুক্তির মহাসড়ক’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ কে এম রহমতুল্লাহ, ডাক মন্ত্রণালয়ের সচিব নূর উর রহমান, হুয়াওয়ে টেকনোলজিস (বাংলাদেশ) লিমিটেডের সিইও ঝাং ঝেং জুন উপস্থিত ছিলেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ মেলায় স্থান পেয়েছে নানা ধরনের রোবট। মেলায় ডিজিটাল প্রযুক্তির মহাসড়ক বিনির্মাণে অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা এবং পরিবর্তিত বিশ্বে নতুন সভ্যতার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আইওটি, রোবটিক্স, বিগ ডেটা, ব্লকচেইন ও ফাইভ-জির বিস্ময়কর প্রভাব প্রদর্শন করা হচ্ছে। প্যারেন্টাল কন্ট্রোল, ট্রিপল প্লে (এক কেবলে ফোন লাইন, ইন্টারনেট ও টেলিভিশন সংযোগ), মোবাইল অ্যাপ, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা ও নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রদর্শিত হবে এ মেলায়। জেডটিই, হুয়াওয়ে, নকিয়া ও এরিকসন ফাইভ-জি প্রযুক্তির প্রদর্শন করবে মেলায়। ইন্টারনেট সেবাদাতাসহ (আইএসপি) ৮২টি প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নেবে। এতে ২৫টি স্টল, ২৯টি মিনি প্যাভিলিয়ন ও ২৮টি প্যাভিলিয়ন রয়েছে।
পরে সজীব ওয়াজেদ জয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ভোলায় ই-এডুকেশন সেবা কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। আমাদের ভোলা দক্ষিণ প্রতিনিধি জানান, বৃহস্প?তিবার ভোলা জেলার দৌলতখান উপজেলার বিচ্ছিন্ন চ?রের ১ নম্বর মদনপুর ইউনিয়?নের চর মদনপুরের ৩৮ নম্বর মদনপুর চর পদ্মা মকবুল আহম্মেদ জাতীয়করণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ই-এডু?কেশন সেবা উ?দ্বোধন ক?রেন সজীব ওয়াজেদ জয়। এ সম?য় জয় ব?লেন, ২০৪১ সা?লের ম?ধ্যে এক?টি উন্নত রা?ষ্ট্রের প্র?তিষ্ঠা পা?বে বাংলা?দেশ। তিনি বলেন, আই?টি সেক্টর ও টেলিকমিউনি?কেশন সেক্টরের উন্ন?তির ফ?লে ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সব তথ্যপ্রযু?ক্তি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁ?ছে গে?ছে। আইটি সেক্ট?রে বাংলা?দেশ ২০২১ সা?লের ম?ধ্যে উন্নত রা?ষ্ট্রের কাতা?রে পৌঁছ?বে ব?লে তি?নি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এ সময় সরকা?রের সব উন্নয়ন কার্যক্রম নি?য়ে দৌলতখান-বোরহানউদ্দিন এলাকার এমপি আলী আজম মুকুলের সঙ্গে কথা বলেন সজীব ওয়াজেদ জয়। ?দৌলতখা?নের অব?হেলিত বিচ্ছিন্ন চরের ৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করার মধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ?শিক্ষার আ?লো পৌঁছে দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হা?সিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এমপি মুকুল ব?লেন, সরকারের ব্যাপক উন্নয়নের ছোঁয়া চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমানের প্রসার ঘটেছে, ডিজিটাল সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে, কোনো মানুষই এখন বিচ্ছিন্ন নয়। এ সময় তিনি মদনপুর চ?রে বেড়িবাঁধ ও ১০ শয্যা হাসপাতাল করার দাবি জানান। প?রে উপ?স্থিত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন সজীব ওয়া?জেদ জয়। এ টেলিকনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন ভোলা জেলা প্রসাশক মাসুদ আলম সিদ্দিক, পুলিশ সুপার সরকার মো. কায়সার, জেলা শিক্ষা অফিসার জাকিরুল হক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নিখিল চন্দ্র হালদার, দৌলতখান উপজেলা চেয়ারম্যান মন্জুর আলম খান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিতেন্দ্র কুমার নাথ, শিক্ষা অফিসার মো. হোসেনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও শিক্ষকগণ উপস্থিত ছিলেন।