বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের বাংলার গণমানুষের প্রাণের নেতা হয়ে ওঠার পিছনে একটা বড়ো কারণ সম্ভবত তিনি মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালোবাসেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর থেকে প্রায়ই তিনি আক্ষেপ করে বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রোটোকলের কারণে তিনি আর আগের মতো সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে পারেন না। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রপতিকে সম্ভবত এমন সাবলীলভাবে আক্ষেপ করতে শোনা যায় না।
জাতীয় সংসদে স্পিকার থাকাকালীন তিনি সংসদ ভবনে প্রবেশ করে প্রথমে ছুটে যেতেন সাংবাদিকদের কাছে। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য নৈশভোজের আয়োজন করেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি রসিক মানুষ, তার সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দের। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে একটু অবাক হতে হলো। একটি তরুণ লেখক সাহিত্যিক অনুবাদকদের প্রতিনিধিদল সম্প্রতি তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করে।
সাক্ষাতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ কষ্টার্জিত স্বাধীনতার সুফল তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সহায়তা করার জন্য লেখক, অনুবাদক ও সাহিত্যিকদের প্রতি আহ্বান জানান। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ঐদিন সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে তরুণ লেখক, অনুবাদক ও সাহিত্যিকদের একটি প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করতে এলে তিনি এ আহ্বান জানান।
অথচ এমন তরুণ লেখক সাহিত্যিক পরিচয়ে যারা গিয়েছেন তাদের কোনো প্রতিনিধিদল নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একজন সংস্কৃতিবান্ধব মানুষ, সাহিত্যের ছাত্রী। তিনি প্রায়ই বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করেন। কিন্তু সেখানেও কোনো প্রতিনিধিদল গিয়ে হাজির হয়েছেন এমন শোনা যায় না। তাহলে প্রতিনিধিদলের নামে যারা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত্ করে আসলেন তারা কারা? লিটারারি এজেন্ট বা সাহিত্যিক প্রতিনিধি বলে একটা প্রতিষ্ঠিত পেশা আছে সাহিত্যের দুনিয়ায়। তারা প্রতিষ্ঠিত কিংবা তরুণ সাহিত্যিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেন এবং উপযুক্ত প্রকাশকের হাতে তুলে দেন। লেখক রয়্যালিটি, মুদ্রণ, পুনর্মুদ্রণ, বিজ্ঞাপন, বিক্রীয় সংখ্যার হিসাব-নিকাশ, এমনকি লেখকের সাহিত্যিক ক্যারিয়ার নিয়ে সাধারণত কাজ করে থাকেন তারা এবং বিনিময়ে লেখকের কাছ থেকে ১০-১৫ পার্সেন্ট মজুরি পেয়ে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশে এই সাহিত্যিক প্রতিনিধি পেশাটা এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা পায়নি। কোনো সাহিত্যিকের প্রতিনিধি আছেন এমন কখনো শোনাও যায়নি। তাহলে হুট করে একদল সাহিত্যিক প্রতিনিধি কোথা থেকে হাজির হলেন সেটা বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের জন্য একটা রহস্যজনক ঘটনা।
তবে সংবাদের সঙ্গে প্রকাশিত একটি আলোকচিত্রে দেখা যায় বেশ কিছু কবি সাহিত্যিক হাসি হাসি মুখ করে রাষ্ট্রপতির পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। সাহিত্যিকরা কেন তাদের সাহিত্যকর্ম বাদ দিয়ে প্রতিনিধির চাকরি করা শুরু করলেন সেটা অবশ্য বিস্তারিত সংবাদটি পড়েও জানা গেল না। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু আলোচনায় উঠে এসেছে, কিছু সাহিত্যিক নিজেদেরকে তরুণ সাহিত্যিকদের প্রতিনিধি দাবি করে নানান কর্মকাণ্ড করে থাকেন। এ সকল কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তারা মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে জানিয়ে এসেছেন। তবে তাদের এই সাহিত্যিক প্রতিনিধি পরিচয় লিটারারি এজেন্ট অর্থে নয়, সাহিত্যিকদের নেতা কিংবা মুখপাত্র ধরনের কিছু একটা তাদের দাবি।
সেই হিসেবে বলতে হয়, সাহিত্যিকদের তো নেতা বা মুখপাত্র থাকার কোনো ব্যাপার নাই। সাহিত্যিকের লেখাই তার একমাত্র মুখপাত্র। অথচ বাংলাদেশের সাহিত্যিকরা জানেনই না তাদের মুখপাত্র অর্থে প্রতিনিধি দাবি করে একদল সাহিত্যিক নানান কর্মকাণ্ড করে বেড়াচ্ছেন এবং সেই গরিমা নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে হাজির হচ্ছেন। এই ঘটনাটা তরুণ সাহিত্যিকদের জন্য সত্যিই বিব্রতকর।
আমাদের দেশে সকল ক্ষেত্রেই একদল স্বার্থান্বেষী লোক দলবাজি করে সরকারের নানান পর্যায়ে যোগাযোগ করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করে থাকেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে আসা তরুণ সাহিত্যিকদের এই প্রতিনিধি নামধারি দলটি তেমন একটি স্বার্থান্বেষী চক্র হতে পারে এমন ভাবার কোনো কারণ নাই, যেহেতু তাদের অনেকেই স্বনামধন্য ও সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তাদের চালু করা এ সংস্কৃতি যে পরবর্তীতে কোনো সুযোগ সন্ধানী মহলের স্বার্থে ব্যবহূত হবে না এমন কোনো কথা নেই। যেহেতু সাহিত্যিকদের কোনো মুখপাত্র বা প্রতিনিধিমূলক জায়গাই নেই, ফলে এইরকম উপাধি ব্যবহার করে সরকার বা রাষ্ট্রের অভিভাবকের কাছে হাজির হওয়াটা সন্দেহের চোখে দেখছেন কেউ কেউ। এ জাতীয় চক্রের বিষয়ে সকলের সচেতন থাকাটা জরুরি।
n লেখক :কবি