পথেই বাড়ি, পথেই ঘর

২০ বছর সেবা দিচ্ছে ‘পথশিশু সেবা সংগঠন’

মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ

ফাহিমা, মীম, বাবলি, লিটন, সুমনা কিংবা দিপু—ওরা এ সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশু। ওদের পথেই বাড়ি , পথেই ঘর। কারো বয়স ছয়, কারো আট কিংবা নয়। ওরা কাওরান বাজারে কেউ সবজি টোকায়, কেউ মাছ বিক্রি করে, কেউ বা মিন্তির কাজ করে। নানা কাজ করেও হয়তো দুবেলা ওদের খাবার জোটে না। কারো অভাবি বাবা-মা, কারো বাবা নেই, কারো আবার মা নেই। এসবই ওদের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। জন্ম নিয়ে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওদের পেটের তাগিদে নামতে হয়েছে পথে। তাই শীত-বৃষ্টি-গরম কিংবা মশা—উপেক্ষা করে পথেই রোজগার করে ওদের কাটাতে হয় জীবন। সভ্য সমাজ ওদের নামকরণ করেছে ‘পথশিশু’।

পথের ঐ শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছে ‘পথশিশু সেবা সংগঠন’। গত ২০ বছর ধরে এই সংগঠনটি কাজ করছে পথশিশুদের নিয়ে। এই সংগঠনে আছে ৩০ জন স্বেচ্ছাসেবী। যারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ-পেশার হূদয়বান মানুষ। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা লুসিও বেনিনাতি বলেন, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভালোবাসা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। এটা আমাদের সমাজের একটা কাজ। এই পথশিশুদের একটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা আমাদের মূল উদ্দেশ্য। আমরা বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে পুর্নবাসনের মাধ্যমে পথশিশুদের সুন্দর ভবিষ্যত্ নির্মাণে সহায়তা করার চেষ্টা করি।

লুসিও ইতালিয়ান নাগরিক। পেশায় ‘ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার’। তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশে প্রথম কাজ করি দিনাজপুরে রেল স্টেশনে। সেটা ১৯৯২ সালের কথা। এরপর ময়মানসিংহে কাজ করেছি, এখন ঢাকায়। আমি ব্রাজিলে এই কাজ শিখেছি। এ কাজে কোনো বিদেশি অনুদান নেওয়া হয় না, বলে জানান লুসিও। আমরা দেখাতে চাই, হূদয়বান বাঙালিরাই এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়াক। ১৩ বছরে কাওরান বাজারে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করছি। এর মধ্যে ৯৫৪ জন শিশুকে এই সেবার অন্তর্ভুক্ত করেছি। আমরা চাই, আরো স্বেচ্ছাসেবী আসুক আমাদের এই কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করুক এবং তরুণদের নতুন নতুন ধারণা দিয়ে এই শিশুদের জন্য কিছু করুক। এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এসে একসঙ্গে সেবা দেয়।

কাওরান বাজারস্থ ওয়াসা ভবনের নিচে কথা হয় লুসিওর সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা শিশুদের শিক্ষা ও চিকিত্সার ব্যবস্থা করে থাকি। পাশাপাশি শিশুরা বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল খেলা করে থাকে। যাতে শিশুদের সৃষ্টিশীলতা বাড়ে, স্মৃতিশক্তি বাড়ে। তিনি বলেন, আমরা রাজধানীর ছয়টি স্থানে কাজ করি। কাওরান বাজার ওয়াসা ভবনের নিচে, কমলাপুর রেল স্টেশনের ৮ নম্বর প্ল্যাটফর্ম, সদরঘাট লঞ্চ র্টামিনাল, গাবতলী বাস টার্মিনাল, গুলিস্থান নাট্যমঞ্চ পার্কের ভিতরে এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। স্বেচ্ছাসেবী ডা. বুলবুল আহমেদ বলেন, আমি ১০ বছর ধরে এই শিশুদের সেবা দিয়ে আসছি। শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আমরা দিয়ে থাকি। শিশুদের হাতে-পায়ে ক্ষত থাকে। সেগুলো আমার চেম্বারে নিয়ে চিকিত্সা দেই। এই শিশুদের উন্নয়নে নিবিড় তদারকি দরকার। আরেক স্বেচ্ছাসেবী অমৃতা ডি কস্তা জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তিনি বলেন, আমাদের সপ্তাহে চার স্থানে শিশুদের নিয়ে কাজ হয়। শিক্ষার্থী রাফিউল হাসান বলেন, আমাদের ফেসবুকে একটা গ্রুপ আছে। সেখানে লুসিও ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমরা কাজ করি। লুসিও বেনিনাতি বলেন, আমাদের আরো স্বেচ্ছাসেবী দরকার। তাহলে আমরা আরো বেশি জায়গায় কাজ করতে পারব। আমাদের সঙ্গে কাজ করতে চাইলে ই-মেইল, ফেসবুক বা মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন— pothoshishu.sheba@gmail.com, facebook.com/ pothoshishu.sheba, মোবাইল-০১৯২২০২৫৮০৬ ,০১৫২১২১২৪৩২।