এক দশকে সবজি উত্পাদন বেড়েছে ৩৭ শতাংশ

কোনটি শীতকালীন আর কোনটি গ্রীষ্মকালীন সবজি এটা এখন আলাদা করাই দায়। কারণ সারা বছরই দেশে প্রায় সব ধরনের সবজিই পাওয়া যাচ্ছে। গত এক যুগে দেশে রীতিমতো সবজি বিপ্লব ঘটেছে। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, মাত্র ৯ বছরের ব্যবধানে দেশে সবজির উত্পাদন বেড়েছে ৩৭ শতাংশেরও বেশি। গ্রামের আবাদি জমি থেকে শুরু করে রাজধানীর বহুতল বাড়ির ছাদ, এমনকি বারান্দার টবেও এখন জায়গা করে নিয়েছে কোনো-না-কোনো সবজি।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সবজি উত্পাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে তৃতীয়। প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে চীন ও ভারত। তবে সবজি উত্পাদনে বাংলাদেশ ব্যাপক সফলতা অর্জন করলেও মাথাপিছু চাহিদা অনুযায়ী সবজি গ্রহণে এখনো পিছিয়ে রয়েছে। সেইসঙ্গে উত্পাদিত সবজি কতটা নিরাপদ সেই প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিন একজন মানুষের ২২০ গ্রাম সবজি গ্রহণ করা উচিত। সেখানে দেশে দৈনিক মাথাপিছু সবজি গ্রহণের পরিমাণ গড়ে ১৬৬ গ্রাম। বছরে ৬০ কেজি। যদিও ২০ বছর আগে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ৪২ গ্রাম। অথচ জাপান, জার্মানি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রতি বার্ষিক সবজি ভোগের পরিমাণ যথাক্রমে ১০০, ৯২ ও ১১৬ কেজি।

সবজি বিপ্লবের কারিগর

দেশের কৃষকরাই এই সবজি বিপ্লবের মূল কারিগর। তবে অল্প সময়ে অধিক লাভ হওয়ায় দেশের শিক্ষিত তরুণরাও এখন সবজি চাষে এগিয়ে আসছেন। শুধু তাই নয়, বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি উত্পাদনে তারা বড়ো ভূমিকা রাখছেন। একসময় দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোরেই কেবল সবজির চাষ হতো। কিন্তু এখন দেশের প্রায় সব এলাকায় সারা বছরই সবজি চাষ হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে ৬০ ধরনের ২০০ জাতের সবজি চাষ হচ্ছে। দেশের ১ কোটি ৬২ লাখ কৃষক পরিবার; যারা প্রায় সবাই কমবেশি এই সবজি চাষে জড়িত। তবে রাজধানীসহ সারাদেশে শহরাঞ্চলেও এখন অনেকে শখের বশে সবজি চাষ করছেন। যার পরিমাণ একেবারে কম নয়। শহরে বাড়ির ছাদে এখন ‘ছাদ কৃষি’ খুবই জনপ্রিয়।

প্রতি বছরই বাড়ছে সবজি উত্পাদন

দেশে প্রতি বছরই বাড়ছে সবজি উত্পাদন। মূলত আশির দশক থেকে পালটাতে শুরু করে সবজি চাষের চিত্র। ভাত, ডাল, মাছ-মাংসের পাশাপাশি শরীরের পুষ্টির জন্য সবজিও যে গুরুত্বপূর্ণ সেটা বুঝতে শুরু করে সাধারণ মানুষ। সেইসাথে মানুষের               ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিও সবজি উত্পাদন বাড়ার ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে।

মাত্র এক দশকের ব্যবধানে সবজি উত্পাদন বেড়েছে ৩৭ শতাংশের বেশি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশে সবজি উত্পাদন হয় ১ কোটি ২৫ লাখ ৮০ হাজার টন। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১ কোটি ৩২ লাখ ২১ হাজার টন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৩৯ হাজার টন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ কোটি ৪২ লাখ ৩৭ হাজার টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ কোটি ৫২ লাখ ৬৪ হাজার টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ কোটি ৬০ লাখ ৪২ হাজার টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৫৪ হাজার টন। আর সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১ কোটি ৭২ লাখ ৪৭ হাজার টন সবজি উত্পাদন হয়েছে।

দেশের এই সবজি বিপ্লবে উন্নত জাতের বীজ ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের রয়েছে বড়ো ভূমিকা। সবজি বিভাগ উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্র এখন পর্যন্ত ৩৪টি সবজির ১০৭টি জাত অবমুক্ত করেছে। যার মধ্যে ৯২টি উন্মুক্ত পরাগায়িত এবং ১৫টি হাইব্রিড। এ ছাড়াও হাইব্রিড বীজ উত্পাদনের ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। নতুন নতুন উদ্ভাবিত জাতের বীজ কৃষক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিলে সবজির চাষের পরিধি আরো বৃদ্ধি পাবে। সেইসঙ্গে সবজি বিপণনে আধুনিক বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তাহলে কৃষক তার কষ্টার্জিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবে।

পটোল, বরবটি যাচ্ছে ইউরোপে

দেশের পটোল, বরবটি, শিম, বেগুনসহ প্রায় সব ধরনের সবজি যাচ্ছে ইউরোপসহ বিশ্বের ৫০টি দেশে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৯ কোটি ৯৭ লাখ ডলারের সবজি রফতানি হয়। চলতি অর্থবছরে সবজি রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ কোটি ডলার। ইপিবি জানিয়েছে, গত ৬ মাসে রফতানি হয়েছে ১২ কোটি ৮৮ লাখ ডলারের সবজি। এখনো ছয় মাস বাকিই রয়েছে। এই হিসাবে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ডলারের সবজি রফতানি হবে বলে আশা করা যায়।

দেশে সবজি বিপ্লব প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গত এক দশকে দেশে সবজি উত্পাদনে বিপ্লব ঘটে গেছে। অন্যসব সেক্টরের চেয়ে কৃষি সেক্টরে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। রফতানিও অব্যাহতভাবে বাড়ছে। তবে এখন আমরা বিষমুক্ত সবজি উত্পাদনে  বেশি জোর দিচ্ছি।

ড. রাজ্জাক বলেন, এটা আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জ। বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি নিয়ে রাজধানীর সেচভবন প্রাঙ্গণে ‘কৃষকের বাজার’ চালু করা হয়েছে। এই বাজারে যে চাষিরা সবজি নিয়ে আসছেন, তাদের আমরা এক বছর ধরে প্রস্তুত করেছি। এটা একটি মডেল বাজার। এই বাজারের সফলতায় আগামীতে আরো বড়ো পরিসরে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় এ রকম বাজারের আয়োজন করা হবে। এতে একদিকে ভোক্তারা যেমন বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি পাবে, তেমনি কৃষকরাও সরাসরি ক্রেতাদের কাছে তাদের সবজি বিক্রি করতে পারবেন।