বিদ্রোহীরা মাঠ ছাড়তে নারাজ

আসন্ন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারণা জমজমাট হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা উদয়াস্ত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। মেয়র প্রার্থীদের মতোই দুই দলের ওয়ার্ড কাউন্সিলররাও শশব্যস্ত। তবে দুই দলেরই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মনোনীত কাউন্সিলরদের বাইরে মাঠে সক্রিয় বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে। তারা কোনোভাবেই মাঠ ছাড়তে চাচ্ছেন না। দুই দলের পক্ষ থেকে বিদ্রোহীদের বারবার সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিলেও তা কেয়ার করছেন না তারা। তবে বিএনপির কিছু বিদ্রোহী এ ব্যাপারে নমনীয় বলে জানিয়েছেন নেতারা।

জানা গেছে, দুই সিটিতে আওয়ামী লীগের ১১২ এবং বিএনপির ৩৩ জন বিদ্রোহী প্রার্থী প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত রয়েছেন। এর মধ্যে উত্তর সিটিতে আওয়ামী লীগের ৪০ জন, দক্ষিণে ৭২ জন দলের সিদ্ধান্তের বাইরে প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। অন্যদিকে উত্তরে বিএনপির ২১ জন ও দক্ষিণে ১২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে রয়েছেন।

বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে কঠোর অবস্থানে গেছে আওয়ামী লীগ। কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত মেনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করে ভোটের মাঠে সক্রিয় থাকলে সরাসরি বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। দলের পক্ষ থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সরে যেতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছিল। তা গতকাল শেষ হয়েছে। অপরদিকে বিএনপি তাদের দলের বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা করে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছে। সমঝোতায় না এলে কঠোর সিদ্ধান্ত নেবে দলটি।

আওয়ামী লীগে ১১২ বিদ্রোহী :দলীয় তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন দলটির ১১২ জন এবার মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। এই বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে ওয়ার্ড    পর্যায়ে আওয়ামী লীগের কর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একটা অংশ বিদ্রোহীদের পক্ষে কাজ করছেন। আরেকটা অংশ আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছেন। এর ফলে মেয়র প্রার্থীদের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

আওয়ামী লীগের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে না দাঁড়ালে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। গত বুধবার আমু বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে বিদ্রোহী প্রার্থীরা তাদের ওয়ার্ডে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন সঠিক হয়নি দাবি করে নিজেদের জনপ্রিয়তার কথা তুলে ধরেন। অপরদিকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের যেসব নেতা মদত দিচ্ছেন তাদেরও দল থেকে বহিষ্কারের দাবি উঠেছে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, আমরা বিদ্রোহীদের নিয়ে বসে তাদের দুদিনের সময় দিয়েছিলাম। এই সময়ের মধ্যে তাদের দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে কাজ শুরু করতে হবে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি জানান, মহানগর উত্তরে আওয়ামী লীগের ৫ জন বিদ্রোহী প্রার্থী তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাক হুমায়ুন কবীর জানান, এখন পর্যন্ত কেউ সরেছে বলে জানি না। কারণ তারা সবাই মনে করছে তারা পাশ করবে।

আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী যারা: ঢাকা দক্ষিণের ৩০নং ওয়ার্ডে ঢাকা-৭ আসনের এমপি হাজি মো. সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিম। এখানে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হাজী সেলিমের ভাগিনা ও বর্তমান কাউন্সিলর মো. হাসান। ১৯নং ওয়ার্ডে রয়েছেন কাউন্সিলর মুন্সী কামরুজ্জামান, ২২নং ওয়ার্ডে তারিকুল ইসলাম, ৩২নং ওয়ার্ডে বিল্লাল শাহ, ৩৯নং ওয়ার্ডে ময়নুল হক ওরফে মঞ্জু, ৫০নং ওয়ার্ডে দেলোয়ার হোসেন খান, ৭৪নং ওয়ার্ডে আবুল কালাম আজাদ এবং ৯নং ওয়ার্ডে বহিষ্কৃত কাউন্সিলর মমিনুল হক ওরফে সাঈদ। এর মধ্যে চাঁদাবাজির মামলায় কারাগারে আছেন ময়নুল হক। তবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করলেও সাঈদ নির্বাচনী মাঠে নেই। ঐ ওয়ার্ডে সাঈদের স্ত্রী ফারহানা বৈশাখীও নির্বাচন করছেন। ২২নং ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর তারিকুল ইসলাম দলের ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক। তিনি ২০১৫ সালে দলের সমর্থন না পেয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন। এবারও তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। দক্ষিণের ১নং ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন খিলগাঁও থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম। তার বিপরীতে মাঠে রয়েছেন যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহসম্পাদক শাহাদাত হোসেন। ২৪নং ওয়ার্ডে দলীয় প্রার্থী বর্তমান কাউন্সিলর মোকাদ্দেস হোসেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বঙ্গবন্ধু পরিষদের লালবাগ থানার সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন। ২৭নং ওয়ার্ডে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন লালবাগ থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাগর আহমেদ শাহিন।

উত্তরের বিদ্রোহীদের মধ্যে রয়েছেন ৪নং ওয়ার্ডে জহিরুল ইসলাম, ১৪নং ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সহসভাপতি হুমায়ুন রশিদ, ৪৯নং ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর আনিছুর রহমান নাঈম প্রমুখ।

বিএনপির বিদ্রোহী যারা:কাউন্সিলর পদে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে নিষ্ক্রিয় করে দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বিভিন্ন থানার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে বৈঠক করেন নেতারা। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও উত্তর সিটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়কারী মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, কেউ কেউ আমাদের অনুরোধে সাড়াও দিয়েছেন। এ পর্যন্ত ৬টি ওয়ার্ডে সফল হয়েছি।

দক্ষিণ সিটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন: ১৩নং ওয়ার্ডে নজরুল ইসলাম, ১৫নং আবু নাছের লিটন, ৩৭নং সুমন ভুঁইয়া, ৩৯নং ওয়ার্ডে মোজাম্মেল হক মুক্তা, ৪৬নং ওয়ার্ডে মো. সোহেল ও ঢালী মামুনুর রশিদ, ৫১নং ওয়ার্ডে কবির আহম্মেদ, ৫২নং ওয়ার্ডে বাদল রানা, ৫৫নং ওয়ার্ডে শহিদুল হক, ৫৯নং ওয়ার্ডে খোরশেদ আলম খোকন, ৬১নং ওয়ার্ডে শাহ আলম, ৬৬নং ওয়ার্ডে নুরুউদ্দিন মিয়া প্রমুখ।

এছাড়া উত্তর সিটিতে বিএনপির উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন: ৩নং ওয়ার্ডে জামাল হোসেন, ৪নং ওয়ার্ডে ছাব্বির দেওয়ান জনি, ৫নং এ বুলবুল আহম্মেদ মল্লিক, ৬নং এ আমজাদ হোসেন, হাবিবুর রহমান ও রাহাদুল ইসলাম ভুঁইয়া, ৭নং এ গোলাম রাব্বানী, ৮নং এ ছোলায়মান খান দেওয়ান, ১৬নং এ ছৈয়দ আকরাম হোসেন, ১৭নং এ ফরিদউদ্দিন মৃধা, ১৮নং এ আব্দুল লতিফ, ২০নং এ সেলিম আহমেদ রাজু, ২৩নং এ কামাল আহমেদ দুলু, ২৫নং এ হাশেম মিয়া ও জিয়াউর রহমান বাবু, ২৭নং এ আবেদ আলী, ৩১নং এ হাসিনা মোরশেদ কাকলী, ৩৪নং এ ওসমান গণি শাহজাহান, ৩৮নং এ আলী হোসেন, ৩৯নং এ মোহাম্মদ কামরুল, ৪৩নং এ রেজাউল করিম ও ৪৭নং ওয়ার্ডে হেলাল তালুকদার।