সোহাগ মনি
আমরা যা করি তাই আমাদের সংস্কৃতি। আমাদের জীবনের রূপ ফুটে উঠে সংস্কৃতিতে। মানুষের জীবনকে প্রেরণা জোগায় সংস্কৃতির নানান দিক। এই দেশের গ্রাম বাংলার সংস্কৃতি অনেক ঐতিহ্যপূর্ণ। লোকজ সংস্কৃতি এই দেশের মানুষের হূদয়ের কথা বলে, মাটির কথা বলে। সহজ-সাবলীল ভাষায় জীবনের সুন্দরতম দিকটির কথা বলে যায় আমাদের গ্রাম বাংলার লোকজ সংস্কৃতি। কবি গান, পালা গান, জারি গান, মুর্শিদি গান, নৌকাবাইচ, হাডুডু খেলাসহ আরো অনেকরকম ঐতিহ্য আছে এই দেশের, যা বাংলাদেশকে আলাদা করে তুলে অন্য সবার থেকে। একটা সময় এসব সংস্কৃতি মাতিয়ে রাখত গ্রাম বাংলাকে। সময়ের আবর্তনে কেমন যেন মরিচা ধরে গেছে আমাদের এই সংস্কৃতিতে। আগের মতো জৌলুসপূর্ণ হয় না গ্রাম বাংলা। মনে হয় মাটি থেকে অনেক দূরে সরে গেছি আমরা।
পৃথিবী তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। পুঁজিবাদ ও আধুনিকায়ন প্রভাব ফেলবে আমাদের, তার মানে এই নয় যে, নিজেদের শেকড়কে উপড়ে ফেলে তা গ্রহণ করতে হবে। নিজেদের ভেতরের সংস্কৃতিই আমাদের হূদয়কে প্রশান্তি দিতে পারে। গ্রাম বাংলার মাটি ও মানুষের কথা বলে যাওয়া এসব সংস্কৃতি যত হারিয়ে যাবে, বাংলাদেশ তত সম্পদ হারাবে। বাংলাদেশের সঙ্গে বাংলা শব্দটি জড়িত, আর এই বাংলা মানে অনেক কিছু বহন করে লোকজ সংস্কৃতির, কিন্তু লোকজ সংস্কৃতি যদি হারিয়ে যায় তাহলে এই বাংলা নামের কোনো অর্থ থাকবে না। নিজেদের কাছে নিজেরাই পরাজিত হব আমরা।
লোকজ সংস্কৃতি ২১ শতকে এসে হারিয়ে যেতে বসেছে। বিভিন্ন বাধা বিঘ্নতার বেড়াজালে আবদ্ধ হতে চলেছি আমরা। কিছু গোষ্ঠী এই সংস্কৃতিকে অবদমিত করে রাখতে চাচ্ছে, চেষ্টা করছে বাংলা থেকে যেন এই সংস্কৃতি চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়। আবার আমরা নিজেরাও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখার ফলে বিকাশ ঘটছে না এসব সংস্কৃতির। নিজেদের ভেতরকে জাগিয়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর লোকজ সংস্কৃতি। লোকজ সংস্কৃতি আমাদের এই দেশের সবচেয়ে বড়ো ঐতিহ্য। এই অনুধাবন আমাদের করতে হবে। জীবনকে ভাবতে শেখায়, জানতে শেখায় লোকজ সংস্কৃতির দিকগুলো। চার দিকে যখন হতাশা, আর বিষণ্নতায় পরিপূর্ণ আমাদের জাতীয় জীবন সেখানে এসব সারল্য মাখা সংস্কৃতিই আমাদের দিতে পারে অনেকটা প্রশান্তি। আমাদের জীবন যাত্রা দিন দিন গভীর সংকটে পতিত হচ্ছে, নিজেদের ভেতরকে আমরা খুঁজছি না, কেবল মরীচিকার পেছনে ছুটে নিজেদের শেকড় তুলে ফেলছি। আমাদের নিজেদের বলে আর কিছু থাকছে না, মনে প্রশান্তি দিতে পারছে না কোনো কিছু। লোকজ সংস্কৃতি আমাদের মাটির কাছাকাছি নিয়ে যায়, মানুষকে ভালোবাসার কথা বলে, জীবনকে ভালোবাসতে বলে, এই সংস্কৃতিকে আমরা যত দূরে ঠেলব, আমাদের যান্ত্রিকতার জীবন তত বিষাদময় হয়ে উঠবে।
এখনই সময় আমাদের লোকজ ঐতিহ্যকে ধরে রাখার। সময় যত পার হচ্ছে মূল সংস্কৃতি ততই বিকৃত হয়ে উঠছে। নিজেদের অবস্থান থেকে আমাদের গ্রাম বাংলাকে টিকিয়ে রাখতে হলে, সবার আগে এই সংস্কৃতির দিকটিতে চোখ রাখতে হবে। কোনো কালো থাবা কিংবা সময়ের কালস্রোতে যেন হারিয়ে না বসি আমাদের মাটির কথাকে, ভালোবাসার সুরকে। দেশের স্বনামধন্য ও সংস্কৃতিবান লোকদের কিছু পদক্ষেপই পারে আমাদেরকে রক্ষা করতে। সরকারেরও সুদৃষ্টি প্রয়োজন। জীবনের শ্রেষ্ঠতম দিকগুলোকে হারিয়ে ফেললে আমরা কেবল হতাশার দিকেই ঝুঁকে পড়ব। নদীর বুকে হয়তো আর শোনা হবে না, ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে আমি আর বাইতে পারলাম না’, কোনো বাউল গানের সুর হয়তো আমাদের মনে আলোড়িত করবে না। আর এই দিকগুলো না থাকলে আমরা কিসে বাঙালি হব?
n লেখক :শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়