এম এইচ রহমতুল্লাহ
জরুরি অবস্থার সময়কালীন অস্থায়ী সরকারের আমলে প্রণীত দুর্নীতি দমন কমিশনের ‘চাকরি বিধিমালা, ২০০৮’ এর ৫৪(২) নম্বর বিধিতে বলা হয়েছে—‘এই বিধিমালায় ভিন্নরূপ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কোন কারণ না দর্শাইয়া কোন কর্মচারীকে নব্বই দিনের নোটিস প্রদান করিয়া অথবা নব্বই দিনের বেতন নগদ পরিশোধ করিয়া তাহাকে চাকুরী হইতে অপসারণ করিতে পারিবে!’ সিআইএ, কেজিবি, এসআইএস-এর চাকরিতেও বোধ হয় এধরনের বিধান নেই! ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যে আপনি একজনকে একটি লাঠি দিয়ে পেটাবেন, পেটে লাথি মারবেন, অথচ বলবেন না যে লোকটার অন্যায় কী! এই অসঙ্গতিপূর্ণ বিধি অবিলম্বে বাতিল করা প্রয়োজন এই কারণে যে—১. এটা সম্পূর্ণরূপে বাংলাদেশের মহান সংবিধানের ১৩৫(২) নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। সংবিধানের ‘অসামরিক সরকারি কর্মচারীদের বরখাস্ত প্রভৃতি’ শীর্ষক অধ্যায়ে ১৩৫(২) নম্বর অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে—‘অনুরূপ পদে (প্রজাতন্ত্রের অসামরিক পদে) নিযুক্ত কোন ব্যক্তিকে তাহার সম্পর্কে প্রস্তাবিত কোন ব্যবস্থা গ্রহণের বিরুদ্ধে কারণ দর্শাইবার যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দান না করা পর্যন্ত তাহাকে বরখাস্ত, অপসারিত বা পদাবনমিত করা যাইবে না।’
কেউ হয়তো বলবেন—দুদক ‘স্বাধীন’ প্রতিষ্ঠান বিধায় এর কর্মচারীরা ‘সরকারি কর্মচারী’ নয়। এটাও বাস্তবতা বিবর্জিত চিন্তা। কারণ, সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদে প্রথাগত অর্থে ‘সরকারি কর্মচারী’দের কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত অসামরিক ব্যক্তিদের’ কথা। দুদকের কর্মচারীরা সরকারি তহবিল থেকে বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন এবং প্রজাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সুতরাং ভাষার মারপ্যাঁচ বা শব্দের চাতুর্য দিয়ে বাস্তবতাকে চাপা দেওয়ার অবকাশ নেই। তারা প্রজাতন্ত্রের তহবিল থেকে বেতন-ভাতা নেবেন, আমৃত্যু পেনশন পাবেন, প্রজাতন্ত্রের বড়ো বড়ো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত/ মামলা করবেন, যে কোনো সরকারি ডকুমেন্ট ‘সিজ’ করতে পারবেন, যে কোনো পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন, অথচ বলা হবে—তারা ‘সরকারি কর্মচারী না’! তাহলে তারা কী? ব্র্যাক-আশার মতো এনজিও কিংবা নাবিস্কো-হক বিস্কুট ফ্যাক্টরির কর্মীদের মতো বেসরকারি কর্মচারী? তারা অবশ্যই ‘প্রজাতন্ত্রের অসামরিক পদে নিযুক্ত কর্মচারী।’
২. সারা দুনিয়ার রোমান, কম্যুনিস্ট, ইসলামিক, কোনো ধরনের আইনের জুরিস্প্রুডেন্সে কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে শাস্তি আরোপের ধারণার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। ‘শাস্তি’ বলতে শুধু জেল-ফাঁঁসিই বোঝায় না, চাকরিচ্যুতিও একটি ‘শাস্তি’। শুধু শাস্তি নয়, গুরুতর শাস্তি। সুতরাং বিনা বিচারে, না শুনে তথা ডেলিংকোয়েন্টের বক্তব্য না জেনে এবং তাকে কারণ না দর্শিয়ে চাকরিচ্যুত করাটা এককথায় জুরিস্প্রুডেন্সের পরিপন্থি।
৩. কারণ দর্শানোর নোটিস ইস্যু না করে বা কোনো প্রসিডিংস ব্যতিরেকে এবং কোনো কারণ না দেখিয়ে সরাসরি চাকরি থেকে বিদায় দেওয়ার এই বিধানের কারণে দুদকের কর্মচারীরা, বিশেষত তদন্তকারী ও তদন্ত তদারকির দায়িত্বে থাকা অফিসাররা শঙ্কামুক্তভাবে কাজ করতে পারেন না। দুদকের অনেক মামলাই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রুজুকৃত। দৈবাত্ কখনো সরকার পরিবর্তন হলে কী হবে, সেটা নিয়ে এসব মামলার আইও এবং তদারককারীদের মধ্যে দুশ্চিন্তা থাকাটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। একটি অন্য দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসলে কমিশনকে রাষ্ট্রপতি ‘চায়ের দাওয়াত’ দেবেন এবং এই কমিশনারদের কেউ চা খেয়ে কেউবা না খেয়ে বিদায় নেবেন! তখন নতুন কমিশন এসে যে খালেদা-তারেক-হারিস চৌধুরীদের (যদি কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে পারেন) বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসারগুলোকে এই ৫৪(২) নং বিধির প্রয়োগ করে চাকরি খেয়ে পত্রপাঠ বাড়ি পাঠিয়ে দেবে, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ আছে কি?
প্রসঙ্গত দুদক চাকরি বিধিমালার আরো একটি বিধান নিয়ে অনেকের মতো আমারও আপত্তি আছে। বাংলাদেশের অন্য সব সরকারি, আধাসরকারি, সেক্টর-করপোরেশনের চাকরিজীবীরা বছরে মোট ২০ দিন এবং একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১০ দিন (পার্বত্য এলাকায় ১৫ দিন) নৈমিত্তিক ছুটি ভোগ করতে পারেন। অথচ দুদক চাকরি বিধিমালার ২৪(২) নম্বর বিধিতে বলা হয়েছে— ‘কোন কর্মচারীকে একসঙ্গে তিন দিনের বেশি নৈমিত্তিক ছুটি দেওয়া যাইবে না।’ এখন কথা হচ্ছে—একজন কর্মচারীর বাড়ি যদি হয় সিলেট-মৌলভীবাজারের কোনো প্রত্যন্ত এলাকায় আর তার পোস্টিং থাকে বরিশাল বা পটুয়াখালীতে, তাহলে তার স্ত্রী-সন্তান কিংবা মাতা-পিতার অসুস্থতাজনিত কারণে কিংবা অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজনে বাড়িতে যেতে-আসতেই তিন দিন লেগে যাবে! প্রসঙ্গত দুদকের এই বিধিতে পার্বত্য এলাকায় নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্যও কোনো ছাড় রাখা হয়নি! তাদের জন্যও ওই তিন দিনই! এটা সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘সমতার নীতি’রও পরিপন্থি।
সুতরাং সরকারের উচিত দুদকের চাকরি বিধিমালা থেকে জুরিস্প্রুডেন্সের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই অযৌক্তিক বিধি দুটি ৫৪(২) এবং ২৪(২) প্রত্যাহার/সংশোধন করার উদ্যোগ নেওয়া।
n লেখক : সাবেক দুদক কর্মকর্তা