প্রকাশনী ও ছাপাখানার বদৌলতে বইয়ের জগত্ পুরান ঢাকার বাংলাবাজার। শ্রীশদাস লেনের বাংলাবাজারের পাশে অবস্থিত বিউটি বোর্ডিং। বই প্রকাশ ও বই সংগ্রহের কারণে কবি-সাহিত্যিকদের আসা যাওয়া হতো বাংলাবাজারে। দেশ-বিভাগের পূর্বে সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার অফিস বর্তমান বিউটি বোর্ডিংয়ে ছিল কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডাস্থল। ষাটের দশকের বাংলা কবি-সাহিত্যিকদের জাগরণে বিউটি বোর্ডিং ছিল প্রাণবন্ত। শামসুর রহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আহমেদ ছফা, সমর সেন, সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক এখানে আসতেন। তত্কালীন দেশের প্রেক্ষাপটে তারা রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রচনা করতেন কবিতা, নাটক, গল্প ও উপন্যাস। সাহিত্যের সঙ্গে রাজনীতির সংযোগে বিউটি বোডিংয়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের আসা যাওয়া ছিল। ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, আইয়ুব খানের মার্শাল ল’ বিরোধী আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধের সুতিকাগার ছিল পুরান ঢাকার এই বিউটি বোর্ডিং। গত শুক্রবার ৬০ দশকের কবি-সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের মিলনমেলায় পরিণত হয় বিউটি বোর্ডিং। সবাই স্মৃতি রোমন্থনে ফিরে যান ৬০-এর দশকে।
নুরুল মজিদ হুমায়ুন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রাণকেন্দ্র ছিল পুরান ঢাকা। তত্কালীন জগন্নাথ কলেজ, কায়েদে আজম কলেজ, বিউটি বোর্ডিং ছিল বাঙালিদের নিয়ন্ত্রণে। ষাটের দশকের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন এই বিউটি বোর্ডিং থেকেই শুরু হয়। ৬২, ৬৯ ও ৭০-এর নির্বাচনের ইতিহাস পুরান ঢাকা ও বিউটি বোর্ডিংয়ের সঙ্গে জড়িত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭০-এর নির্বাচনে এই আসন থেকেই নির্বাচিত হয়েছিলেন।’
মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, ‘রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রবিন্দু এক সময় ছিল এই পুরান ঢাকা। বিউটি বোর্ডিংয়ে কবি-সাহিত্যিকরা সবাই আসতেন। এখান থেকেই ষাটের দশকের আন্দোলনের পরামর্শ হতো। সেসময় দলমত নির্বিশেষে সবাই পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিল।’
চিত্রনায়ক আলী আকবর পাঠান ফারুক এমপি বলেন, ‘আমি মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রামে ছিলাম। জগন্নাথ কলেজ ছিল স্বাধীনতার আতুড়ঘর। সেসময়ে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে ছাত্রলীগের সুসম্পর্ক ছিল। সেসময়কার সবার দেশপ্রেম ছিল এমন যে, সবাই একেক জন সূর্যসেন ও প্রীতিলতা। আমরা সবাই ছিলাম তখন বঙ্গবন্ধু। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম গুলি ছোটে পুরান ঢাকা থেকে। এই যে বিউটি বোর্ডিং এখানকার অবদান কম নয়। এই জায়গাটা ছিল নিরাপদ আশ্রয়স্থল। পকেটে টাকা থাকতো না। সারাদিন মিছিল মিটিং করে আসতাম। বড় ভাইয়েরা বিল দিতো। আবার এখানে বাকি খেতাম। যার টাকা কোনো সময় দিতাম না। বিউটি বোর্ডিংয়ের মালিক আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছেন।’ কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি রাজনীতি করতাম। ৩৭টি মামলা খাওয়ার পর পরে সংস্কৃতি অঙ্গনে আসি। বোডিংয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক নয়।’
স্বাধীনবাংলা বেতারের শিল্পী মনোরঞ্জন ঘোষাল বলেন, ‘১৯৬৩ সাল থেকে এখানে এসে বসতাম। জগন্নাথ কলেজের ছাত্র ছিলাম। ক্লাসের বাকি সময়টুকুর আড্ডাস্থল ছিল এটি। এখানে এসে জহির রায়হান, সমর সেন, খান আতাউরসহ নামীদামি কবি-সাহিত্যিকদের দেখতাম। আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই বোর্ডিংয়ের স্মৃতি অনেক। রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করলে ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে আমরা মিছিল নিয়ে বর্তমান প্রেসক্লাবের সামনে পর্যন্ত যেতাম। ফিরে এসে বিউটি বোর্ডিংয়ে বসতাম।’
সাংবাদিক কামাল লোহানী বলেন, ‘বিউটি বোর্ডিংয়ে সকল দলমত নির্বিশেষে লোক জমা হতো। ষাটের দশকের মার্শাল ল বিরোধী আন্দোলন এখান থেকেই শুরু হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও বিপ্লবীদের আড্ডাস্থল ছিল বিউটি বোর্ডিং। আর সাহিত্যিকদের মধ্যে শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমানরা এখানে আড্ডা দিতেন।’
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘বিউটি বোর্ডিং ছিল ঢাকার কফি হাউজ। আমি জুবলী স্কুলে পড়তাম। এখানে কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডা ছিল। আমরা দূর থেকে তাদের দেখতাম। সৈয়দ শামসুল হক এখানে বসেই সাহিত্য রচনা করতেন।’
জগন্নাথ কলেজের ভিপি আলমগীর শিকদার লোটন বলেন, ‘স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তিদের আড্ডাস্থল ছিল বিউটি বোর্ডিং। ৭০-এর নির্বাচনে আমার আব্বা গণপরিষদের সদস্য ছিলেন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকে এখানে আসা হত। এখনো প্রতিদিন এখানে বসি।’
ঢাকা শহরের ষাটের দশকের একাত্তরের বিপ্লবী সতীর্থদের মিলনমেলার আয়োজক পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি ফিরোজ কবির মুকুল বলেন, ‘৬৪-তে এসএসসি পরীক্ষা দিই। তখন থেকে এখানে বসতাম। ৬০-এর দশকের বিপ্লবীদের নিয়ে ১৯৯৬ সাল থেকে এখানে মিলনমেলা আয়োজন করে আসছি।’
ষাটের দশকের বিপ্লবীদের মিলনমেলায় এ সময় আরো উপস্থিত ছিল কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ, অভিনেতা পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়, এসপি মাহাবুব, ইঞ্জিনিয়ার কামাল, পার্টি হাউজের ফিরোজ, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা পাক্কা, কাজী মোহাম্মদ হেদায়াত উল্লাহ, পল্টু ভাই, মুক্তিযোদ্ধা কামরুল হাসান খানসহ শতাধিক বিপ্লবী।