আকাশে রঙের ছটা, উড়ছে হাওয়ায় ঘুড়ি। বিভিন্ন রঙ ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে। কতই না রঙ খেলা করছে আকাশে। এমনই এক দৃশ্যের দেখা মেলে সাকরাইন উত্সবে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উত্সব ঘিরে আগন্তুকের মনে রয়েছে না কৌতুহল। তাইতে উত্সবটিতে সামিল হতে পুরান ঢাকায় ভিড় জমান অনেক পর্যটক।
পৌষ মাসের ঠিক শেষের দিনটিতে উত্সবে মাতেন সবাই। পৌষসংক্রান্তির শেষদিনেই পালিত হয় সাকরাইন উত্সব। এ বছর সকালে ঢাকায় ঘন কুয়াশা থাকায় দুপুরের পর থেকে শুরু হয় এ উত্সব। সন্ধ্যা পর্যন্ত আকাশজুড়ে ওড়ে নানারঙের শতশত ঘুড়ি। ছাদে ছাদে সব বয়সীদের ভিড়। শিশু-কিশোররা ব্যস্ত ঘুড়ি নিয়ে। এদিন যুবক-বৃদ্ধারাও বসে ছিলেন না, একদিনের জন্য তারাও ফিরে গেছেন কৈশোরে। এ যেন আকাশ দখলের উত্সব!
বিকেল ঘনিয়ে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের পুরো চিত্রটাই বদলে গেল! যারা এতক্ষণ ঘুড়ি নিয়ে কাটাকাটিতে ব্যস্ত ছিল তারা খেলছে আগুন খেলা। মুখে কেরোসিন নিয়ে আগুন ছুঁড়ে মারছে আকাশের দিকে। প্রতি সাকরাইনে মুখে কেরাসিন নিয়ে আগুন ফুঁ দেন তন্ময়। এই খেলায় কখনো দুর্ঘটনা ঘটেছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগুন নিয়ে খেলা করার সময় পুরান ঢাকায় এখনো কোনো দুর্ঘটনার খবর জানি না। তবে ছাদে ঘুড়ি ওড়ানোর সময় অনেকেই ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।’
পুরান ঢাকায় ঘুড়ি ওড়ানোর এই খেলা শুরু হয় মোঘল আমলে। কথিত আছে, নবাব নাজিম মহম্মদ খাঁ ১৭৪০ সালে ‘ভো কাট্টা’ অর্থাত্, ঘুড়ি উত্সবের সূচনা করেন। আজো পালিত হচ্ছে এই ঘুড়ি উত্সব। জানা গেছে, পশ্চিম ভারতের গুজরাটেও এই ঘুড়ি উত্সব পালিত হয়। সেখানে মানুষ সুন্দর সুন্দর ঘুড়ির মাধ্যমে সূর্য দেবতার কাছে নিজেদের অব্যক্ত ইচ্ছা প্রেরণ করেন। উত্তর ভারতীয় এ ঘুড়ি উত্সবটিকে স্থানীয়রা সাকরাইন নামে অভিহিত করে।
সাকরাইন উত্সবে ঘুড়ি ওড়াতে প্রয়োজন হয় চিকন সুতা ও পাতলা কাগজের ঘুড়ি। ঘুড়ি তৈরির এই রীতিও অত্যন্ত প্রাচীন। ঘুড়ি যত হালকা হবে সেটি উড়বেও দ্রুত। এ উত্সবে ঘুড়ি ওড়ানোর বদলে অন্যের ঘুড়ির সঙ্গে টেক্কা দিতেই ব্যস্ত থাকেন প্রতিযোগীরা। সুতায় সুতায় প্যাঁচ লাগিয়ে কাটার চেষ্টায় মেতে থাকেন তারা। স্থানীয় ভাষায় একে বলে কাটাকাটি। ঘুড়ি কেটে যাওয়ার পর বিজয়ী ঘুড়ি আকাশে উড়তেই থাকে আর কেটে যাওয়া বাতাসে দুলতে দুলতে মিলিয়ে যায় দূর আকাশে।
আবার কেটে যাওয়া এসব ঘুড়ির অপেক্ষায় ছোটরা চিকন বাঁশ নিয়ে ঘুড়ে বেড়ায়। এই চিকন বাঁশকে লগি বা লগগি বলে। তারা প্রথমদিন ঘুড়ি ধরে জমায় এবং দ্বিতীয় দিন এ ঘুড়িগুলো ওড়ায়। এ প্রতিযোগিতায় সুতাটাই অন্যতম। ঘুড়ির সুতাকে মজবুত ও ধারালো করতে মাঞ্জা দেওয়া হয়। এজন্য সুতা ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লেইতে ভিজিয়ে রাখা হয়। শিরিষ, রঙ, বার্লি, ডিম, বিভিন্ন ডালের কষ, ভাতের মাড় ইত্যাদির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে লেই বা ল্যাদ্দি তৈরি করা হয়।
নির্ধারিত সময়ের পর রিল থেকে সুতা নাটাইয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়। শিরিষের আঁঠার জন্য সুতার সঙ্গে সুতা যেন না লেগে যায় তার জন্য রিল থেকে নাটাইয়ে সুতা যাওয়ার মাঝপথে দু’জন সুতায় চূর লাগিয়ে দেয়। এ চূর তৈরি করা হয় কাঁচের গুঁড়া দিয়ে। মাঞ্জা দেওয়া শেষ হলে এ সুতা শুকানোর জন্য সব সুতা ছেড়ে দিয়ে ঘুড়ি ওড়ানো হয়। এ সময় তারা কারো সঙ্গে কাটাকাটি খেলে না। সাকরাইনের ৩ থেকে ৪ দিন পূর্বে মাঞ্জা দেওয়া হয়। মাঞ্জার গুণাগুণের ওপর নির্ভর করে প্রতিযোগীরা টানে অথবা ছোঁড়ে, কোন পদ্ধতিতে পরাজিত করবে অন্যকে। অতীতে সাকরাইন উত্সবে পুরান ঢাকায় শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইদের নাটাই, বাহারি ঘুড়ি উপহার দেওয়ার রীতি ছিল। সেইসঙ্গে পিঠার ডালা পাঠানোর চল ছিল। ডালা হিসেবে আসা ঘুড়ি, পিঠা আর অন্যান্য খাবার বিলি করা হতো আত্মীয়স্বজন এবং পাড়া প্রতিবেশীদের। কার শ্বশুরবাড়ি কতটা সমৃদ্ধ তার প্রয়াস ঘটানো হতো। তবে বর্তমানে এসব রীতি বিলুপ্ত হওয়ার পথে। তবে এসব বিষয় সম্পর্কে বয়স্করা নতুনদের গল্প শোনান। জানা যায়, ব্রিটিশ আমলের এই উত্সবটি এখন বাংলাদেশের সব মানুষ পালন করেন। পুরনো আমলে গান বাজতো মাইকে, আর এখন লাউডস্পিকারে গান বাজানো হয়। আগে এলাকাবাসী সীমাবদ্ধ ছিলেন খিচুড়িতে, এখন বিরিয়ানিতেই মুগ্ধ হয় তরুণ প্রজন্ম।