জেলার ভারত সীমান্তঘেঁষা উপজেলা সাপাহার। বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত জেলার এই সাপাহার উপজেলা। এই উপজেলাতে উত্পাদিত সুস্বাদু আমের খ্যাতি রয়েছে দেশজুড়ে। বর্তমানে এই বরেন্দ্র অঞ্চলে উত্পাদিত আম জেলার ব্যান্ডিং পণ্যে পরিণত হয়েছে। এই উপজেলার আরেকটি ঐতিবাহী দর্শনীয় স্থান হলো জবই বিল। শীত এলেই এই ঐতিহ্যবাহী জবই বিল পরিযায়ী (অতিথি) পাখিসহ নানারকমের পাখির কলতানে মুখরিত হয়ে ওঠে। প্রতিবছর শীত মৌসুমের শুরু থেকে সুদূর রাশিয়া, সাইবেরিয়াসহ বিশ্বের শীত প্রধান দেশ থেকে শতশত পাখি এসে ভিড় জমায় এই বিলে। আর এসব সুন্দর সুন্দর পাখির আগমনে জবই বিল তার নিজ সৌন্দের্যের বিকাশ ঘটাচ্ছে। প্রতিনিয়ত এই অতিথি পাখিসহ নানা জাতের নানারকমের পাখি দেখার জন্য নওগাঁ জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা এসে ভিড় জমায়।
জেলা সদর থেকে প্রায় ৬২ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত সীমান্তবর্তী এই উপজেলা সাপাহার। সাপাহার উপজেলার শিরন্টি ইউনিয়নে অবস্থিত এই জবই বিল। সাপাহার উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে জবই নামক স্থানে প্রায় হাজার একর জমিতে বিস্তৃত এই ঐতিহ্যবাহী বিল। পর্যটকদের অবস্থানের জন্য সাপাহার সদরে রয়েছে মানসম্মত আবাসিক হোটেল। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় পথে নেই কোনো দুর্ভোগের সমস্যাও।
বিদেশ থেকে আসা পিয়াং হাঁস, পাতি সরালি, লেংজা হাঁস, বালি হাঁস, পাতি কূটসহ দেশি জাতের শামুকখোল, পানকৌড়ি, ছন্নি হাঁস বিল এলাকা মুখরিত করে তুলছে। অতীতে এক শ্রেণির মানুষ অবাধে বিল থেকে এসব অতিথি পাখি শিকার করে হাটবাজারে বিক্রি করতো। এমনকি গতবছরও এলাকার কতিপয় ব্যক্তি এ বিল থেকে বেশকিছু পাতি সরালি হাঁস ফাঁদ পেতে ধরে বিক্রিয় করার সময় জবই বিল জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সমাজ কল্যাণ সংস্থার সদস্যদের কাছে ধরা পড়েন। পরে ওই পাখি শিকারিদের উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ভ্রাম্যমাণ আদালত শাস্তি প্রদান করে। এরপর থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কঠোরতা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কমিটির সদস্যদের জোরালো নজরদারিতে বিল এলাকায় যেকোনো ধরনের পাখি শিকার বন্ধ রয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে বর্তমানে দেশ-বিদেশ থেকে নানারকম পাখির আগমনে পুরো বিল এলাকা মুখরিত হয়ে উঠছে।
বেশ কয়েকবছর ধরে এই এলাকার কিছু উত্সাহী যুবক জবই বিল জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সমাজ কল্যাণ সংস্থা নামে একটি সংগঠন তৈরি করে বিলে অতিথি পাখিসহ সব ধরনের পাখি শিকার বন্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এছাড়া বিলে কোনো কচুরিপানা না থাকলেও সরকারি ও বেসরকারিভাবে মত্স্যজীবীরা খরা মৌসুমে বিলের পানি শুকিয়ে গেলে মা মাছগুলো রক্ষায় বিলের মধ্যে বেশকিছু এলাকায় বাঁশ, কাঠ ও কিছু কচুরিপানা দিয়ে কাঠা নামের একটি করে মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তোলে।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি সোহানুর রহমান সোহান জানান, বর্তমানে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কমিটির সদস্যদের প্রচেষ্টা ও স্থানীয় মত্সজীবীদের তৈরিকৃত কচুরিপানার কাঠা থাকায় অতীতের মতো আবারো আস্তে আস্তে শীত মৌসুমে দেশি-বিদেশি পাখি অবাধে বিলে আসতে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে বিলের বিশাল অংশে কচুরিপানা দিয়ে মাছসহ পাখিদের বড় ধরনের অভয়াশ্রম এবং বিলের বিভিন্ন দ্বীপে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়ে বনাঞ্চল তৈরি করলে সারাবছর বিল এলাকায় পাখিদের আনাগোনায় জবই বিল আবারো ফিরে পেতো তার ঐতিহ্য ও নাব্যতা।
এরইমধ্যে অনেক পাখিপ্রেমিক ব্যক্তি পাখির সৌন্দর্য দেখতে বিল এলাকায় এসে ভিড় জমাচ্ছে। বিল পাড়ে পর্যাটকদের জন্য ঘোরাফেরা ও বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হলে ভবিষ্যতে সাপাহারের জবই বিল এলাকাটি একটি পর্যটক কেন্দ্রে রূপ নিতে পারে বলেও অনেক পর্যাটকসহ এলাকাবাসীরা মনে করেন।
নওগাঁ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার সাপাহার উপজেলার জবই বিলটিকে একটি ঐতিহ্যবাহী পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পদক্ষেপ হাতে নিয়েছেন বলে উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কল্যাণ চৌধুরী বলেন, ‘পূর্বে জবই বিল নানা সমস্যায় জর্জড়িত থাকলেও সবার সার্বিক সহযোগিতায় বর্তমানে বিলটি পর্যটকদের জন্য একটি চমত্কার বিনোদনের স্পটে পরিণত করা হয়েছে। তবে একটি আধুনিকমানের বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যে খাদ্যমন্ত্রী ও জেলা প্রশাসন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আশা করছি জবই বিলকে ঘিরে গৃহীত এই প্রদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা হলে জবই বিল একটি আধুনিক বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হবে। এছাড়া শীত মৌসুমে এই বিলে জড়ো হওয়া অতিথি পাখিসহ নানারকমের পাখি দেখতে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।’