স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে চাঙ্গা ভাব তরুণ ভট্টাচার্য, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সমাগমে মুখর হয়ে উঠেছে খাগড়াছড়ি। শীতের মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গে পর্যটকদের সমাগমে পর্যটন স্পটগুলোও ফিরে পেয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য। পর্যটকদের সামাল দিতে দস্তুরমতো হিমশিম খাচ্ছে সব হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোর মালিক আর কর্মচারীরা। এ মুহূর্তে বলতে গেলে পর্যটকে পরিপূর্ণ পাহাড়ি এ শহর খাগড়াছড়ি । পাশাপাশি বেচা-কেনায় সরব হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রসামগ্রী ও চারু-কারু পণ্যের দোকানগুলো। এসব দোকানে চাহিদা ও বিক্রি বেড়েছে পর্যটক আকর্ষণীয় পণ্য ও পাহাড়িদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যমণ্ডিত বর্ণিল পরিধেয় বস্ত্রসামগ্রীর। সবমিলিয়ে খাগড়াছড়ির ব্যবসা-বাণিজ্যে এখন চলছে চাঙ্গাভাব।
পার্বত্য চট্টগ্রামের খ্যাতনামা বস্ত্র বুনন প্রতিষ্ঠান বেইন টেক্সটাইল, বয়ন টেক্সটাইল, বনানী টেক্সটাইল ও পাহাড়িকা টেক্সটাইলের উত্পাদিত বস্ত্রাদির চাহিদা এখানে সর্বাধিক। বিভিন্ন উপজাতীয় সমাজ জীবনের চারপাশে ব্যবহূত বাঁশ, বেত ও কাঠের পণ্যসামগ্রীর চাহিদাও কম নয়। বিগত তিন বছরের ব্যবধানে খাগড়াছড়িতে হাজার হাজার পর্যটকের ভ্রমণের সুবাদে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে উল্লেখযোগ্যহারে। আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত এখানকার প্রায় সব হোটেল-মোটেল ও কটেজ ভাড়া হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব ভ্রমণপিপাসুর থাকার ব্যবস্থা করতে খাগড়াছড়ি ও মেঘপুরি সাজেকে কমপক্ষে ২০০ হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। খাগড়াছড়িতে এখন প্রতিদিনই দেড় থেকে ২ হাজার ভ্রমণপ্রেমীর উপস্থিতি চোখে পড়ে। এখানে পর্যটকরা বেড়ানোর ফাঁকে স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত ঐতিহ্যবাহী পণ্য-সামগ্রী কেনাকাটায় আগ্রহী থাকেন বেশি। পাহাড়িকা টেক্সটাইলের মালিক হারাধন দে ও ব্যবস্থাপক মিজ সুনীতা নন্দী জানান, পাহাড়ি রমণীদের কোমর তাঁতে বানানো থামী, খাদি, পিনন, ব্লাউজ, জুম্ম শাড়ি, গামছা, বাঁশ-কাঠের তৈরি বিভিন্ন শো-পিসের ব্যাপক চাহিদা নারী পর্যটকদের কাছে। পর্যটকদের চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে আমাদের দোকানে আকর্ষণীয় পণ্য তোলা হয়েছে। ক্রেতা ও চাহিদা বাড়ায় পাহাড়িদের পণ্য বিক্রির দোকান ক্রমশ বাড়ছে। স্থানীয় খাবারের হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে সকালের নাস্তা থেকে রাতের আহারের সময় পর্যন্ত পর্যটকের ভীষণ ভিড় চোখে পড়ার মতো।
শহরে কেনাকাটা করার সময় কথা হয় নরসিংদী থেকে সাজেকে বেড়াতে আসা হাবিবুর রহমান ও মো. মানিকের সঙ্গে। তারা জানান, সত্যিই খাগড়াছড়ি ও সাজেক ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অনন্য একটি ক্ষেত্র। বুধবার এখানে এসেই সাজেকে গিয়েছি। অপূর্ব একটি পর্যটন স্পট। তবে এক বা দুই জনে ভ্রমণে এসে তেমন সুবিধা নেই। গ্রুপ করে আসলেই উপভোগ্য হবে, খরচও কম হবে। তাদের মতে, কেনাকাটায় তারা ঠকছেন। সাগরকন্যা কক্সবাজারের দোকানগুলোর চাইতেও পণ্যের মূল্য বেশি। ঢাকার বস্ত্র ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম জানান, আমি পাঁচ বছর ধরে এ অঞ্চলে আসছি। এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। পাহাড়ে ও সমতলে স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত পণ্যের চাহিদাও বেড়েছে।
খাগড়াছড়ির বিলাসবহুল আবাসিক হোটেল অরণ্যবিলাসের মালিক স্বপন চন্দ্র দেবনাথ ও হোটেল নূরের মালিক ছালে আহমেদ এই প্রতিনিধিকে জানান, গত ডিসেম্বর মাস থেকে হোটেলে পর্যটকদের চাপ বেড়েছে। অগ্রিম বুকিংয়ের চাপ এখনো আছে। জেলা শহরে পর্যটকদের আবাসন ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রশাসনের সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। সাজেকের রিসোর্ট ও হোটেল-মোটেল পরিচালনায়ও একটা নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। খাগড়াছড়ি চেম্বার অ্যান্ড কমার্সের পরিচালক সুদর্শন দত্ত পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকারের আরো মনোযোগ দরকার। সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পটগুলোকে আরো সাজানো দরকার। প্রস্তাবিত ক্যাবল কার স্থাপনের কাজও শুরু করা জরুরি। তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ সন্ধ্যার পর জেলা শহরে পর্যটকদের বিনোদন ব্যবস্থা করা হলে পর্যটকদের ভ্রমণে আগ্রহ বাড়বে।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্মলেন্দু চৌধুরী জানান, আলুটিলা পর্যটন স্পটের সৌন্দর্য বর্ধনে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ কাজ শুরু করেছে। সেখানে একটি কানেক্টিং ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের সহযোগিতায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ ক্যাবল কার স্থাপনের কাজও প্রক্রিয়াধীন।
পর্যটন মৌসুমে এখানে অতীতে পর্যটকদের অবাধ যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত পরিবহন বা যানবাহন সুবিধা ছিল না। এখন এ পরিবহন ব্যবসায় ব্যক্তিগত উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়াতে পর্যটকদের ভ্রমণ সুবিধা যেমন বেড়েছে তেমনি আগামীতে পর্যটকদের ভ্রমণ সুবিধা বৃদ্ধিতে পরিবহন মালিকদের মধ্যেও প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। পর্যটক সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানকার কৃষিপণ্য উত্পাদনকারীরাও লাভবান হচ্ছেন। পর্যটক আকর্ষণীয় কৃষিজ ও ফলদ পণ্য আনারস, ডাব, পেঁপে, কলা, তেঁতুল, মাল্টা, কমলা, আমলকি, জাম্বুরা ও বেলসহ বিভিন্ন ফলের পাশাপাশি আদা, হলুদ গুঁড়া, কাকন চাল, সাদা তিল, পাহাড়ি ভুট্টার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়ভাবে এর উত্পাদনও বহুমাত্রায় বেড়ে গেছে।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধিকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটনশিল্প স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে একটি হস্তান্তরিত বিভাগ। তাছাড়া পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এখানে সমন্বিত কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন। তারপরও সম্ভাবনাময় পর্যটনশিল্পের বিকাশের কথা বিবেচনা করে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন আলুটিলা পর্যটন স্পট ও রিছাং ঝরনায় যাতায়াতের রাস্তার উন্নয়নের কাজ হাতে নিয়েছে।