ঋতু

ছোটোবেলার শীত

লোকমান ফরাজী

আমাদের ছোটোবেলায় শীত আসত অক্টোবরের হালকা কুয়াশার মধ্য দিয়ে। যা হেমন্তের শেষ সময়। তারপর নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—চার মাসব্যাপী শীতের আবহ থাকত। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে শীতের প্রকোপ থাকে সবচেয়ে বেশি; ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি কমতে শুরু করে। তখন শুরু হয় বসন্ত, চারদিকে নানা রঙের ফুল ফোটে, পাখির কলরব শোনা যায়। বসন্তের শুরুতেও শীত কিছুটা থাকেই।

ছোটোবেলায় মামাবাড়িতে বেড়াতে যাওয়া হতো শীতকালেই। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে শীতের পিঠা খেতে। আমার মামাবাড়ি লালমাই পাহাড়ের পাদদেশে বাতাবাড়িয়া গ্রামে। শিল্পী এস এম সুলতানের ছবির মতো। ছিল গোয়ালঘর, হালের গরু, কৃষক, হাঁস-মুরগি, গ্রামজুড়ে অসংখ্য গাছ। মামাবাড়ির উত্তর দিকে বড়ো দিঘি, দক্ষিণে বিস্তৃত ফসলের জমি, পশ্চিমে একটি পুকুরের ওপারে ঘন জঙ্গল। আর পূর্বে সারি সারি আম, কলা, কাঁঠাল, পেঁপে বাগানের পর বিশাল লেকের পাশ দিয়ে সড়ক।

এত গাছগাছড়ার মধ্যে শীতকালে আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য থাকত ভোরবেলা খেজুরগাছে উঠে কলস নামিয়ে খেজুররস পান। এর যে অনুভূতি, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। খেজুররস খাওয়া শেষে আমরা বহুদূর হাঁটতাম, গ্রামের অলিগলিতে। ফিরে এসে দেখতাম সবাই পিঠা খাচ্ছে। শুরু হতো পিঠা খাওয়া। কত রকমের পিঠা, অনেক পিঠার নাম ভুলে গেছি। অঞ্চলভেদে এক এক পিঠার ভিন্ন ভিন্ন নাম। এক একদিন একেক রকমের পিঠা বানাতেন মামি। ছোটো খালা আমাদের খুব আদর করতেন। তিনি শীতলপাটি, মোড়া, জলচকি নিয়ে রোদে বসে আমাদের সঙ্গে গল্প করতেন আর পিঠা খেতেন। ভাপা পিঠা, চিতৈ পিঠা, বড়া পিঠা, পুলিফাঁপা, মেড়া পিঠা, চিনিসংসার পিঠা, বকুল পিঠা—আরো নানা পিঠা বানানোর আয়োজন চলত শীতের সময় গ্রামের বাড়িতে।

আমি কৃষক পরিবারের সন্তান। ভোরবেলা সবজিখেতে চারাগাছে জল দিতে যেতাম। জল দিতে দিতে হাতের আঙুলগুলো অবশ হয়ে যেত প্রায়ই। মাঝে মাঝে শীতে গা কেঁপে উঠত। কলেজে পড়ার সময় ইংরেজি পাঠ্যবইয়ের ‘এ মাদার ইন মেনভিল’ গল্পটি পড়ার সময় ছোটোবেলার শীতের দিনগুলির কথা বেশ মনে পড়ত। কুয়াশা যেদিন বেশি হতো, সেদিন গাছে জল দিতে হতো না। তাছাড়া বিকেলবেলাও চারাগাছে জল দিতে হতো। চারাগাছগুলোতে ভোরের শিশিরের দৃশ্য কী যে অপূর্ব লাগত। সূর্যের আলোয় সেসব শিশিরবিন্দু হারিয়ে যেত।

শীতের বাতাস সাধারণত প্রবাহিত হতো উত্তর দিক থেকে। আমাদের বাড়ির উত্তরপাশের পুকুরপাড়ে গেলে শীতের হিমেল হাওয়া যেন উত্তরের হিমালয় থেকে ধেয়ে আসছে দক্ষিণে—এমনই মনে হতো।