‘ছদ্মবেশী’ সাম্রাজ্যবাদী!

শফিকুর রহমান রয়েল

 

২৭ জানুয়ারি, ২০১৮। রুশ ইতিহাসের জন্য দিনটি অবশ্যই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ঐ দিন জোসেফ স্ট্যালিনের পর রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রেসিডেন্ট বনে যান ভ্লাদিমির পুতিন। কিন্তু সেটিকে স্মরণীয় করে রাখতে কুচকাওয়াজ বা আতশবাজির কোনো ব্যবস্থা ছিল না। হতবুদ্ধি করে দেওয়ার মতো কোনো ভাস্কর্য উন্মোচন কিংবা পারমাণবিক মিসাইল প্রদর্শনীর ঘটনাও ঘটেনি। সর্বোপরি, পুতিন নিজেকে লিওনিদ ব্রেজনেভের সঙ্গে তুলনায় যেতে রাজি ছিলেন না, অথচ ঐ মানুষের ক্ষমতায় থাকার রেকর্ডকেই তিনি সেদিন ছাপিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৬৪ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নকে শাসন করা ব্রেজনেভ ছিলেন পুতিনের দৃঢ়চেতা যৌবনবেলার নেতা, দীর্ঘ অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে যিনি কিনা কার্যত সাম্রাজ্যকেই পতনের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত হয়ে পড়েছিলেন কোটি কেটি মানুষের হাসির পাত্র। জরাজীর্ণ রাষ্ট্রের জরাজীর্ণ পিতামহ; লক্ষ্যহীন রাশিয়ান ট্রেনের পরিচালক—এমন অনেক মন্তব্যই করা হতো তাকে লক্ষ্য করে। জোসেফ স্ট্যালিন যেমন দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে কেবল একজন ব্যক্তি দিয়েই দেশ চালনা সম্ভব। অন্যদিকে, ব্রেজনেভ প্রমাণ করেছিলেন, আসলে একটা দেশকে পরিচালনারই প্রয়োজন নেই।

পুতিন শাসকরূপে যখন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে এলেন কিংবা প্রয়োজনস্বরূপ সরকারযন্ত্রের ন্যূনতম অংশ হিসেবে তার আবির্ভাব ঘটল, তখন তিনি বেছে নেন ভিন্ন কয়েকটি পদ্ধতি। এর মধ্যে পছন্দের তালিকায় থাকা দীর্ঘতম পদ্ধতি হচ্ছে পিটার দ্য গ্রেটের দুর্বিনীত ভাব। সোভিয়েত পরবর্তী ১৯৯০-এর দশকে সেন্ট পিটার্সবার্গের অন্ধকারময়তা ও অপরাধপ্রবণতার সময়টায় তিনি ছিলেন ডেপুটি মেয়র। তার অফিসকক্ষের দেওয়ালে তখন শোভা পেত এক আধুনিক জারের (পিটার দ্য গ্রেট) ছবি, যিনি ‘পশ্চিমের জনালা’ থেকে হাজারো ভূমিদাসের হাড়ের ওপর সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরটাই নির্মাণ করেছিলেন। তার মতো সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাননি পুতিন। কেজিবির এক অখ্যাত সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেলকে গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত ঐ শহরের সর্বপ্রথম মেয়রের দক্ষিণ হস্তে পরিণত হওয়ার আগ পর্যন্ত পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বার্থে পরতে হয়েছে নানা ধরনের মুখোশ। অনুবাদক, কুটনীতিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসকের ভূমিকায়ও দেখা গেছে তাকে।

শৈশব খুবই কষ্টের। যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে শহরের এক জঘন্য এলাকায় বেড়ে উঠেছেন তিনি। আত্মজীবনীতে ‘ইঁদুরের দলবলের’ বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার কথা উল্লেখ করেছেন পুতিন। নগণ্য ও নামেমাত্র অ্যাপাটর্মেন্টের একটি মাত্র কক্ষে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতে হয়েছে তাকে, যেখানে গরম পানি ও স্টোভের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। কিন্তু কথা হচ্ছে, পিটার দ্য গ্রেটের এমন কোনো গুনই ছিল না, যাতে করে তিনি পুতিনের কাছে আদর্শ হতে পারেন। তবু তিনি তার কাছে আদর্শ ছিলেন এবং এখনো আছেন। গত গ্রীষ্মে বিশ্বখ্যাত দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া দীর্ঘ ও দাম্ভিক এক সাক্ষাত্কার দিতে গিয়ে পশ্চিমা ধাঁচের উদারনীতির অধঃপতন এবং পশ্চিমের ‘আর যুক্তিসিদ্ধ নয়’ বহু সংস্কৃতিকে বুকে টেনে নেওয়ার বিষয়টাকে সাক্ষাত্কার গ্রহণকারীর সঙ্গে উদ্যাপন করেছেন। কোন নেতাকে তিনি সবচেয়ে বেশি ভক্তি করেন, পত্রিকার সম্পাদক লিওনেল বারবারের করা এমন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে কোনো রকম ইতস্তত না করেই বলেন, ‘পিটার দ্য গ্রেট। কিন্তু তিনি এখন মৃত। তিনি ততদিনই বেঁচে থাকবেন, যতদিন তার কাজগুলো বেঁচে থাকবে।’ পিটার দ্য গ্রেটের প্রতি তার ভক্তি কতটা কল্পিত, সেটি আসলে বড়ো কোনো বিষয় নয়। তাই তো সাক্ষাত্কার দিতে গিয়ে তিনি মাঝেমধ্যে নিজেকে যেন জার (রুশ সম্রাট) রূপে তুলে ধরছিলেন। দুই দশকের সরকারি জীবনের কাজের ধারা বর্ণনার সময় কখনো আবার তাকে মনে হয়েছে, তিনি পালন করে যাচ্ছেন সোভিয়েত সাধারণ সচিবের ভূমিকা।

স্কুলে জোর করে হজম করানো মার্কসবাদী-লেনিনবাদী নীতির উপাসনা করাটাকেই ধর্ম ভেবে বড়ো হয়েছিলেন পুতিন। টেলিভিশনে পরাশক্তিরূপে নিজ দেশের বীরোচিত প্রদর্শনী দেখতেন। সাম্রাজ্যবাদী জাঁকজমক বিলীন হয়ে গেলেও পিটারের নিজ শহরের উচ্চাকাক্ষা কিন্তু এখনো বিদ্যমান—এ বিষয়টি পুতিনের মনে ভীষণভাবে দাগ কাটে। শক্তির পাশাপাশি রাশিয়ার সম্রাটদের আদর্শ বাণী ‘প্রগাঢ় নিষ্ঠা, স্বৈরতন্ত্র ও জাতীয়তা’ আজকের পুতিনবাদের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতিতে সোভিয়েত বিজয়গাথা ও শ্রমিকদের বীরত্বের কাহিনি স্মরণ করাটা ছেলেবেলায় আবশ্যক থাকলেও পরিণত বয়সে এসে সম্রাটদের গল্প মনে করতেই বেশি পছন্দ করেন।

ব্রেজনেভকে আদর্শ মানেন না পুতিন। কিন্তু ঐ সতর্কীকরণমূলক গল্পটা কি ভুলে গেলে চলে? যদি গল্পটা সত্যি হয়, বৈরিতার অবসান, ১৯৭০-এর দশকের হ্রাস এবং ১৯৮০-র দশকের প্রারম্ভে পুতিন তখন তরুণ কেজিবি কর্মী। এটি আজকালকার তদন্তের চেয়ে বেশি কিছু, পুতিন তার নিজ কর্তৃক বর্ধিত প্রভুত্বের (দীর্ঘ পরিসর অধিকন্তু স্থায়ী অনিরাপত্তা দ্বারা সংজ্ঞায়িত) কূটাভাসের সম্মুখীন হন। এই অপরাধে তার কঠিন শাস্তি প্রায় নির্ধারিত থাকলেও বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন ব্রেজনেভ। হয়তো পুতিনের বেলায় অনিরাপত্তা শব্দটিই বেমানান। রাশিয়ার নেতা হিসেবে ২০তম বর্ষে এসে তিনি বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। পুতিন ভেলকি দেখানোয় ওস্তাদ। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুকূলে হস্তক্ষেপ সারা বিশ্বের রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিকদের নতুন করে ভাবতে শেখায় এবং তাগিদ জোগায় আরো দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধির। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে বনে যান মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাশিয়ান খেলোয়াড়। চীনের সঙ্গে তার ক্রমবর্ধিষ্ণু মিত্রতা যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে পরাশক্তি প্রতিযোগিতার নতুন যুগ উপস্থাপনে সহায়তা করে। ৬৬ বছর বয়সি পুতিন প্রেসিডেন্ট পদ আঁকড়ে ধরে রাখতে পারবেন ২০২৪ পর্যন্ত। এরপর অবসরে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু অন্তত পুতিনের ক্ষেত্রে নিশ্চিত করে কিছুই বলা যায় না। হয়তো আবারও কোনো ক্যারিশমা দেখিয়ে দেবেন, যাতে করে গদিচ্যুত হওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু কীভাবে কী ঘটল, তা বুঝতে বুঝতেই পেরিয়ে যাবে অনেকটা সময়।