হিমেল আহমেদ
শীতকাল মানেই ভ্রমণ, বনভোজন আর রকমারি পিঠা খাওয়ার উত্সব। বাংলাদেশের মানুষেরা খুব শৌখিন। গ্রামে-গঞ্জে, কিংবা শহরে প্রায় সবাই শীত উপলক্ষ্যে পিঠা খেতে পছন্দ করেন। তেমনি শীত এলেই স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বনভোজনের আয়োজন করা হয়। বিত্তবানদের মধ্যে বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা বেশি। সম্প্রতি ভারতের এক জরিপে জানা গেছে ভারত ভ্রমণে শীর্ষ দেশটি হলো বাংলাদেশ! এই দেশের মানুষ ভারত ভ্রমণেই বেশি আকৃষ্ট! ছোট্ট এই বাংলাদেশ কতটা সুন্দর আর কত মনোমুগ্ধকর জায়গা আমাদের আছে তা নিজে ঘুরে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। তাই আমাদের সবার উচিত প্রথমত নিজের মাতৃভূমি ভ্রমণ করা। প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন হোক অথবা সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর। বান্দরবানের আফিয়াখুম, নাফাখুম অথবা মেঘের রাজ্য সাজেক! এগুলো বাদে আরো অগণিত ভ্রমণের মতো প্লেস আমাদের দেশেই আছে। বাংলাদেশে ভ্রমণের শীর্ষে আছে চট্টগ্রাম। কারণ এখানেই আছে আমাদের একমাত্র সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। যা বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্র কিনারা। সমুদ্র প্রাকৃতিক এক অনন্য নিদর্শন।
কক্সবাজার থেকেই চলে যেতে পারেন সেন্টমার্টিন দ্বীপে। ভারতের কেরালা কিংবা ইন্দোনেশিয়ার বালির চেয়েও কম সুন্দর নয় আমাদের সেন্টমার্টিন। নীল স্বচ্ছ পানি ও পাথরের সমাহারে যে কেউ বিমুগ্ধ হতে বাধ্য। চট্টগ্রামের পর সিলেটের স্থান! ভ্রমণের দিক দিয়ে সারাবছরই সিলেট ভ্রমণ করেন অনেক ট্যুরিস্ট। সিলেটে অগণিত মনোমুগ্ধকর জায়গা রয়েছে যেগুলো না দেখলে হয়তো আপনার জীবনটাই বৃথা! বিছানাকান্দি, জাফলং, রাতারগুল, লালাখাল, লোভাছড়া, হাম হাম, মাধবকুণ্ড, উত্মাছড়া, তরিংছড়া, লক্ষণছড়া, ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর,পান্থুমাই, ব্রিটিশ শাসনামলের কিং ব্রিজ, কুলুমছড়া, শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন চা-বাগান, সুনামগঞ্জের শিমুলবাগান, জাদুকাটা নদী, ডিবরি হাওর, হযরত শাহজালালের মাজারসহ পাহাড় ও বিভিন্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা চা-বাগান দেখে যে কেউ সিলেট জেলার প্রেমে পড়ে যাবেন! তাই তো সিলেটকে বাংলার লন্ডন বলা হয়। ভ্রমণপিপাসুদের মধ্যে যারা পাহাড়, নদী, ঝরনা ভালোবাসেন তারা যেতে পারেন খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি কিংবা বান্দরবান। রাঙ্গামাটির পাহাড় ও ঝরনা দেখে সেখান থেকে ফিরে আসার ইচ্ছেটাই হারিয়ে যাবে! আয়তনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো জেলা রাঙ্গামাটি। এই এলাকার প্রাকৃতিক রূপ-বৈচিত্রের কারণে রাঙ্গামাটিকে রূপের রানি বলা হয়। এখানে ঘুরে বেড়ানো আর দেখার মতো রয়েছে অসংখ্য জায়গা! তাদের মধ্যে অন্যতম হলো সাজেক ভ্যালি। পাহাড়ের ওপর ঘরবাড়ি ও মেঘের সঙ্গে খেলা করার এক অনন্য অনুভূতি পাবেন সাজেকে। দিন দিন পর্যটকদের তীর্থ স্থানে পরিণত হচ্ছে এই সাজেক ভ্যালি। আর যদি রাঙ্গামাটি কেউ যান তাহলে ঝুলন্ত ব্রিজ না দেখে কেউ ফেরেন না! এই ঝুলন্ত ব্রিজ এই জেলার একটি পরিচয় বহন করে আসছে! পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন কিন্তু আমাদের দখলে। তাই সুন্দরবন ভ্রমণ করতেই পারেন যে কেউ! প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর এক অনন্য মিলনমেলা দেখতে পারবেন এখানে।
দেশের একমাত্র চীনা মাটির পাহাড় দেখতে চাইলে নেত্রকোনার বিরিশিরিতে আসুন। সোমেশ্বরী নদীর স্বচ্ছ পানি ও পাহাড় আপনাকে স্নিগ্ধ করবে। কম বাজেটের ভ্রমণ চাইলে ময়মনসিংহের গজনি অবকাশ কেন্দ্রে ও গারো পাহাড় উত্তম। ইতিহাসের পাতায় ফিরে যেতে চাইলে বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়, নওগাঁর পাহাড়পুর, কুমিল্লার ময়নামতি, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, ঢাকার লালবাগ কেল্লা ঘুরে দেখতে পারেন। এছাড়া বাংলাদেশে ৫১৯টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি প্রত্নরত্ন আছে। সময় নিয়ে এক এক করে সব দেখে ফেলুন! এতে জ্ঞান অর্জনসহ ভ্রমণও হয়ে যাবে। পুরো পরিবার নিয়ে ট্যুর করতে চাইলে কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের মুজিবনগর দেখতে ভুলবেন না! বাংলাদেশের স্বাধীনতার চিত্র ভাস্কর্যের মাধ্যমে অপরূপ সুন্দরভাবে সাজানো আছে এখানে। এখন শীতকাল। অনেকেই ভ্রমণের জন্য ভারতের দার্জিলিং যাচ্ছেন, সিকিম যাচ্ছেন কিন্তু আমাদের অনেকের অজানা যে বাংলাদেশ থেকেই দেখতেই পারবেন হিমালয় পর্বত! পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া ও বাংলাবান্ধা থেকে এই শীতের মৌসুমে হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। তেঁতুলিয়ার হিমশীতল আবহাওয়া, চা-বাগান ও কাঞ্চনজঙ্ঘা আপনার মনে প্রশান্তি এনে দেবে, সঙ্গে আছে হিমালয়ের বরফগলা নদী মহানন্দা, কমলার বাগান ও কাজি স্টেটের বিরাট স্বর্গীয় বাগান ও ফার্ম! প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয ছাড়াও আমাদের দেশে অনেক ঐতিহাসিক প্রত্ননিদর্শন ও নতুন স্থান রয়েছে। তাই আসুন আগে নিজের দেশকে জানি।
দেশের পর্যটন শিল্পকে মজবুত করি। সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করব দেশের পর্যটন শিল্পকে আরো উন্নত করুন। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিকরণ ও পর্যটনকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমেই পর্যটনশিল্পকে সুউচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এবং তার সঙ্গে আমরা নিজেরাও সচেতন হই। এই দেশ আমাদের সবার প্রিয় মাতৃভূমি। বাংলাদেশের সকল পর্যটন স্পটের পরিচর্যা ও সুন্দর রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।
n লেখক :শিক্ষার্থী :বগুড়া আজিজুল হক কলেজ