গোমতীর মাটি যাচ্ছে প্লট আর ইটভাটায়!

গোমতীপাড়ের মাটি যাচ্ছে ইটভাটা আর প্লট ভরাটের কাজে। কুমিল্লা সদর থেকে মুরাদনগর পর্যন্ত নদীপাড়ের প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে অবাধে মাটি কেটে ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে দিনে-রাতে লুটে নিয়ে বিক্রি করছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। অপরিকল্পিতভাবে এই মাটি কেটে পরিবহনের কারণে নদী রক্ষাবাঁধ রয়েছে হুমকিতে। প্রতি বছর শীতের মৌসুমে মাটি দস্যুচক্র এ নদীর মাটি ব্যবসায় সক্রিয় হয়। চক্রটি বিভিন্ন এলাকার বসতবাড়ি, হাউজিং প্রকল্পের নিচু জমি ও জমির প্লট ভরাট এবং ইটভাটায় এ মাটি সরবরাহ করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। নদীপাড়ের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে স্থানীয় নানা শ্রেণির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত তিন দিন ধরে গোমতী নদীর পাড় ঘুরে এবং নানা শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমিল্লা আদর্শ সদরের গোমতী নদীর উত্তরপাড়ের গোলাবাড়ি এলাকা হয়ে শাহপুর, সুবর্ণপুর, শালধর, ছত্রখিল, শীমপুর সড়ক, বানাসুয়া, বুড়িচংয়ের শ্রীপুর, কংশনগর, রামপুর, গোবিন্দপুর ব্রিজ হয়ে কুমিল্লা সদরের নদীর দক্ষিণপাড়ের আলেখারচর-দুর্গাপুর, আড়াইওড়া, আমতলী, পালপাড়া, বদরপুর, কাপ্তানবাজার, চাঁন্দপুর, টিক্কারচর, বাজগড্ডা, জগন্নাথপুর, কটকবাজার এলাকায় মাটি কেটে ট্রাক্টরে বোঝাই করে গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া মুরাদনগরের কোম্পানীগঞ্জ, বাখরাবাদ, দনিরামপুর, জাহাপুর, দেবিদ্বারের জাফরগঞ্জ, বড়ো আলমপুর, বিনাইপাড়, বালিবাড়ি, ভিংলাবাড়ি এলাকায় নদীর চরে মাটি কাটা চলছে। শ্রীপুর এলাকায় দেখা গেছে, শতাধিক শ্রমিক কোদাল দিয়ে মাটি কাটছে। এই মাটি ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আবার মাটি আনলোড করে খালি ট্রাক্টর এসে জড়ো হচ্ছে নদীপাড়ে। কোথাও ভেকু, আবার কোথাও কোদাল ও ভেলচায় মাটি কেটে ট্রাক্টরে তোলা হচ্ছে। জানতে চাইলে ময়নাল হোসেন, রাজ্জাক মিয়া, আবুল হোসেনসহ অন্তত ১২ জন মাটিকাটা শ্রমিক বলেন, ‘এখানকার মাটি জেলার বিভিন্ন ইটভাটায় যাচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন হাউজিং প্রকল্পের নিচু জমি, বসতবাড়ি, জমি ভরাটের কাজেও এই মাটি ব্যবহার হচ্ছে।’ পালপাড়া এলাকার ট্রাক্টরচালক আবদুল্লাহ, মোজাম্মেল হক বলেন, ‘গোমতী নদীর শিমাইলখাড়া এলাকা থেকে মাটি নিচ্ছি। আমার এখানে প্রতি ট্রাক্টর মাটির দাম ২৫০ টাকা। শ্রমিক খরচ ও ট্রাক্টর ভাড়া আলাদা। প্রতিদিন একটি ট্রাক্টর ১২ থেকে ১৪ বার মাটি নেয়। এসব মাটির ৭০ ভাগ ইটভাটায় যায়, আর বাকি অংশ আবাসিক-বাণিজ্যিক ভবন ও প্লট ভরাটের কাজে ব্যবহূত হচ্ছে।’

নদীতীরের শ্রীপুর এলাকার শিক্ষক রফিকুল আলম, কৃষক আবদুল আজিজ, জালাল উদ্দিনসহ অন্তত আট জন বাসিন্দা জানান, ‘রাতে-দিনে অবৈধভাবে মাটি কেটে ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে পরিবহনের কারণে বিভিন্ন স্থানে নদী রক্ষাবাঁধ এবং ফসলি জমি ও গাছগাছালির ক্ষতি হচ্ছে। ধুলাবালুতে মানুষের শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ দেখা দিচ্ছে। মাটিকাটা সিন্ডিকেটের লোকজন স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী। তাই তাদের ভয়ে কেউ প্রতিবাদের সাহস পাচ্ছে না।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে শ্রীপুর এলাকার নদীতীরের একাধিক বাসিন্দা জানান, ‘গাজীপুর এলাকার দুই জন, কণ্ঠনগরের একজন, গোবিন্দপুরের একজনসহ ১০-১২ জনের একটি সিন্ডিকেট এই মাটি কাটায় জড়িত। শ্রীপুর ছাড়াও পার্শ্ববর্তী বালিখাড়া, কামারখাড়া, বাবুবাজার, মিথিলাপুর, রামনগর, পূর্বহুরা, নানুয়ার বাজারসহ বিভিন্ন স্থানেও একাধিক সিন্ডিকেট দিন-রাত মাটি কাটছে। মাটি কাটা বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তেমন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লার সভাপতি ডা. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গোমতী নদী একসময় খরস্রোতা ছিল। অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটার কারণে এটি এখন রুগ্ন হয়ে গেছে। তাছাড়া ট্রাক-ট্রাক্টরের শব্দ ও বায়ুদূষণসহ নানা সমস্যা তো রয়েছেই। ভারতীয় অংশে এ নদীর পূর্ণ যৌবন দেখা গেলেও কুমিল্লায় গোমতীকে চেনা যায় না। ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি চক্র এ নদীর গতিপথসহ সবকিছু ধ্বংস করছে। প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। দায়িত্বশীলদের উচিত, দ্রুত এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল লতিফ বলেন, ‘লোকবলের অভাবে আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছি না। এরপরও যখনই অভিযোগ পাই, চেষ্টা করি কিছু করতে। ইতোমধ্যে কয়েকটি মামলাও হয়েছে। অচিরেই নদী এলাকায় অভিযান চালানো হবে।’ কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর বলেন, ‘আমরা এরই মাঝে নদীর বেশ কিছু স্থানে অভিযান চালিয়েছি। সহসা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এক্ষেত্রে জনগণকে সচেতন হয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’