বরাবরের মতো এবারের অর্থবছরের বাজেটেও মূল্য সংযোজন করই (মূসক বা ভ্যাট) থাকছে রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত। আর এ ভ্যাট দেশের ধনী-গরিব সব নাগরিককেই দিতে হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার ৩৭ দশমিক ৮০ শতাংশ ভ্যাট খাতে আদায়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ বিশাল টার্গেট আদায়ে বাজেটে বিলাসবহুল পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি, ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের (ইএফডি) প্রচলন ও আরো নতুন খাতকে ভ্যাটের আওতায় আনা হয়েছে। নির্বাচনি বাজেটে ব্যবসায়ীরা নানা কর ছাড় পেলেও ভোক্তাদের রেহাই নেই। তথ্য মতে, বর্তমান অর্থবছরের বাজেটের আকার ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৯ শতাংশ বেশি। এ বিশাল লক্ষ্য অর্জনে অন্যবারের মতো এবারও ভ্যাটকে গুরুত্ব দিচ্ছে এনবিআর। মূলত ভ্যাট সিস্টেমকে অনলাইননির্ভর করে তোলার প্রত্যাশা নিয়ে এ বিশাল লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। ভ্যাট খাতে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি, আয়কর খাতে ৯৭ হাজার কোটি ও শুল্ক খাতে ৮৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুসারে, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে প্রথম বাজেট দেন তত্কালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। ঐ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে আমদানি শুল্কের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, আবগারি শুল্কে ৫৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং আয়করের ১০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। অর্থাত্ আমদানি শুল্ক রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত। এরপরের অবস্থানে ছিল যথাক্রমে আবগারি শুল্ক ও আয়কর। এর ১৯ বছর পর ১৯৯১ সালে ভ্যাট ব্যবস্থার প্রবর্তনের পর থেকে ভ্যাট ছিল রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত। ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে ভ্যাট আদায় করা হয় ১ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। আর আয়কর আদায় করা হয়েছিল ১ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। এরপর থেকে রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ভ্যাটকে বেছে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের এ ধারাবাহিকতা ভাঙতে একাধিকবার অর্থমন্ত্রী প্রত্যক্ষ কর বা আয়করকে রাজস্ব আয়ের প্রধান খাত হিসেবে পরিণত করার ইচ্ছা পোষণ করলেও ভ্যাটের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেননি। ১৯৭২ সালে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ১.৮ শতাংশ। এ বছর তা ৬.৮ থেকে ৬.৯ শতাংশ হচ্ছে। আমাদের জিডিপি আবার ২৪৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তবে আমাদের অর্থনীতিতে অবৈধ সম্পদের পরিমাণ ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত। অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির পরিধি অনেক বড়ো হয়ে গেছে। আর এটি আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। তাই মানতে হবে আমাদের দেশের অর্থনীতি বড়ো হচ্ছে। বাজেটও বড়ো হচ্ছে। আর তাই এই বাজেট বাস্তবায়নের আরো বেশি অর্থের দরকার হচ্ছে। কিন্তু বিদেশি অর্থের উত্স তুলনামূলক অনেক ছোটো হয়ে আসছে। ফলে অর্থের অভ্যন্তরীণ উত্স বাজেট বাস্তবায়নে বড়ো ভূমিকা রাখছে। পরিসংখ্যান দেখলেই স্পষ্ট সরকারের রাজস্ব আয়ের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ আসে ভ্যাট থেকে। তাই অকপটে স্বীকার করতে হয়, রাজস্ব আয়ে ভ্যাটের ভূমিকা অপরিসীম।
ভ্যাটে বিপুল আয়ের সম্ভাবনা থাকলেও কিছু অসাধু কর্মকর্তার কারণে তা সম্ভব হয় না। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা এনবিআরের জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ। কারণ, এটি বাস্তবায়নে যে ধরনের সক্ষমতা থাকা দরকার, তা এখনো এনবিআরে তৈরি হয়নি। এছাড়াও নতুন আইনে তিনটি হারের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু কোন খাতে কত হবে, তা চূড়ান্ত হয়নি। তাই নতুন আইন বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ। কেননা ব্যবসায়ীদের বিরোধিতাসহ নানা জটিলতার শিকার হতে হবে আইনটির জন্য। দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য, বড়ো বড়ো প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের রাজস্ব আয় দরকার। অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে যে জটিলতা আছে তার ফলে বাণিজ্য উদারীকরণের কারণে আমদানি পণ্যের শুল্ক কমে যাবে। বিষয়টি পরিষ্কার, ব্যবসায়ীরাও ভ্যাট আইন চান, তবে জটিলতাগুলো দূর করা হলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে।
তবে মনে রাখতে হবে যে, ভ্যাট হার বাড়ালে সেটা ভোক্তার ওপর প্রভাব পড়বে। ভোক্তা ও উদ্যোক্তা স্বার্থ মাথায় রেখে ভ্যাট হার বড়ো অঙ্কে নির্ধারণ না করে সহনীয় পর্যায়ে রাখা দরকার। পরে ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় নেওয়া যেতে পারে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এভাবে ভ্যাট আদায় হচ্ছে। অর্থনীতির স্বার্থে কর হারে সমঝোতা করা উচিত। আমাদের এই নতুন ভ্যাট আইন পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে দেশে রাজস্ব বাড়বে, চলমান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বাড়বে এবং সার্বিক দিক থেকে সমৃদ্ধি আসবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, অর্থনীতি (এমএসএস)
তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা