অতীতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করেনি ব্যাংকগুলো। সর্বশেষ জানুয়ারি থেকে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও তা ফের এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই সুদহার এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া নিয়েও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সন্দেহ রয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) বলেছে, সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার কার্যকর যাতে আর না পেছায়। গতকাল সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, অতীতে বলার পর কিছু হয়েছে, আবার পিছিয়ে গেছে। এবার এটি যাতে না হয়। আমরা আশা করছি, এপ্রিলের পর তা আর পেছাবে না।
দেশের চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত ঐ সংবাদ সম্মেলনে ডিসিসিআই এর নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে এক সভায় ব্যাংক মালিকরা সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার এসএমই এর (ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা) ক্ষেত্রে কার্যকর না করার অনুরোধ জানিয়েছে। এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে ডিসিসিআই। শামস মাহমুদ বলেন, এসএমই এর কথা বলেই ব্যাংকগুলোর সরকারের কাছ থেকে নানা সুবিধা নেয়। এসএমইকে এ সুবিধার আওতায় রাখতে হবে। এসএমই এবং ক্ষুদ্র ঋণকে ব্যাংকগুলো এক করে ফেলেছে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক অসহিষ্ণু রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থার বিবেচনায় বাংলাদেশ একটি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। খেলাপি ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ খেলাপি হয়েছে তাদের চিহ্নিত করতে হবে। তবে কোনো উদ্যোক্তা যদি সময়মতো গ্যাস, বিদ্যুত্, অবকাঠামোসহ প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে ব্যবসায়ে লোকসানের কারণে খেলাপি হয়ে থাকেন তাদের বিষয়টিও দেখতে হবে।
ব্যাংক খাত ছাড়াও গ্যাস-বিদ্যুত্ ও জ্বালানি, ভ্যাট-ট্যাক্স ইস্যু, রপ্তানি, জিএসপি ইস্যু, অর্থনৈতিক কূটনীতি, দক্ষতা উন্নয়ন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবসহ বেশকিছু বিষয়ে ঢাকা চেম্বারের অবস্থান তুলে ধরেন সংগঠনটির সভাপতি। দেশের শেয়ারবাজারের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা উদ্বিগ্ন। শক্তিশালী সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট চালু করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি কোম্পানি বাই-ব্যাক এর ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেন এবং সুশাসনের ওপর জোরারোপ করেন তিনি। শেয়ারবাজারের সংকট কাটাতে প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এর ইতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়েছে। বাজারের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গেও আলোচনা করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রপ্তানি আরো বাড়ানোর লক্ষ্যে তৈরি পোশাকের বাইরে অন্য খাতসমূহে উন্নতি করতে হবে এবং সম্ভাবনাময় খাতসমূহের উন্নয়নে তৈরি পোশাক খাতের মতো বন্ডেড ওয়ারহাউজ সুবিধা, ব্যাক টু ব্যাক এলসি, কর অবকাশ সুবিধা প্রদান ও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ডিসিসিআই।
নতুন করে কার্যকর হওয়া ভ্যাট আইনে এসএমই উদ্যোক্তাদের কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, ১৫ শতাংশ ভ্যাটের ক্ষেত্রেই কেবল রেয়াত নেওয়া যাচ্ছে। এর পরবর্তী হারের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা না থাকায় অপেক্ষাকৃত ছোটো ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে হ্রাসকৃত ভ্যাট হারের ক্ষেত্রেও রেয়াত নেওয়ার ব্যবস্থা রাখার দাবি জানান তিনি। এছাড়া গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ইস্যুতে তিনি বলেন, গুণগত মানের গ্যাস-বিদ্যুত্ জরুরি। এখন দাম বড়িয়ে গুণগত মানসম্পন্ন গ্যাস-বিদ্যুত্ পাওয়া না গেলে লাভ নেই। যেসব সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এতে ব্যর্থ হবে, তাদের বিরুদ্ধে জরিমানার বিধান রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
অন্যদিকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়া বেশি হওয়ায় বেসরকারি ঋণপ্রবাহে প্রভাব সম্পর্কিত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। নইলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে না। এজন্য সরকারকে ঋণ করতে হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে বন্ডকে শাক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, উদ্যোক্তারা এখানে তহবিলের ব্যয় বেশি হলে বাইরে থেকে তহবিল আনতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডিসিসিআই এর ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি এন কে এ মবিন, সহ-সভাপতি মোহাম্মদ বাশিরউদ্দিন, পরিচালক আরমান হক, আশরাফ আহমেদ, দীন মোহাম্মদ, এনামুল হক পাটোয়ারী, মো. আল আমিন, রাশেদুল করিম মুন্না, ওয়াকার আহমেদ চৌধুরী প্রমুখ।