বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সমাবেশে করা বোমা হামলার মামলায় হরকাতুল জিহাদের (হুজি) দশ জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, মুফতি মঈন উদ্দিন শেখ, আরিফ হাসান সুমন, সাব্বির আহমেদ, শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মহিবুল মুত্তাকিন, আমিনুল মুরসালিন, মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান ও নূর ইসলাম। ঘটনা সংঘটনের প্রায় দীর্ঘ দুই দশক পর গতকাল সোমবার ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক রবিউল আলম জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি তাদেরকে ২০ হাজার টাকা জরিমানাও করেছে আদালত। রায় ঘোষণার সময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি কাঠগড়ায় ছিলেন। বাকিরা পলাতক রয়েছেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, ইসলাম ধর্ম শান্তি ও সত্যের ধর্ম। মহান আল্লাহ কোনো জঙ্গি সংগঠনকে বা কোনো দলকে ধর্মের নামে নিরীহ ও নির্দোষ মানুষকে হত্যা করার অধিকার প্রদান করে নাই। পবিত্র কোরআনের সুরা ‘মায়িদাহ’ এর ৩২ নম্বর আয়াতে উল্লেখ রয়েছে, ‘যে কেউ কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করে, অন্য কোনো প্রাণের বিনিময় ব্যতীত কিংবা পৃথিবীতে কোনো ফ্যাসাদ সৃষ্টির অপরাধ ছাড়া, সে যেন সকল মানুষকে হত্যা করল।’
রায়ে দুই আসামি মো. মশিউর রহমান ও রফিকুল ইসলাম মিরাজকে বেকসুর খালাস দিয়েছে আদালত। পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেছেন, সিপিবিকে নিশ্চিহ্ন করতেই ঐ হামলা চালানো হয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। সে কারণে এই দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করা ও সমুন্নত রাখার জন্য হুজির এই জঙ্গিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।
এ মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ঢাকার নিম্ন আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। আদালত কক্ষে প্রবেশের আগে তল্লাশিও করা হয়। এ মামলার প্রধান আসামি হুজির শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানের মৃত্যুদণ্ড অন্য মামলায় আগেই কার্যকর হওয়ায় তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। রায়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত।
রায়ে বলা হয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমে দণ্ডিত আসামিরা নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। আওয়ামী লীগের নারায়ণগঞ্জ জেলার নেতা শামীম ওসমান এমপির অফিসে বোমা হামলা ও রমনা বটমূলে বোমা হামলা মামলারও তারা আসামি। এমনকি এই আসামিরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলারও আসামি। আসামিদের প্রতিটি বোমা হামলায় অসংখ্য নিরীহ মানুষ মারা গেছে। তারা পল্টন ময়দানে কমিউনিস্ট পার্টির মহাসমাবেশে বোমা হামলার মাধ্যমে ৫ জন নিরীহ ও নির্দোষ মানুষকে হত্যা করেন। আসামিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র নস্যাত্ করতে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমে নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।’
প্রসঙ্গত, ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি পল্টনে সিপিবি সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায় পাঁচ জন নিহত হয়। আহত হয় অন্তত ২০ জন। এ ঘটনায় সিপিবির তত্কালীন সভাপতি মনজুরুল আহসান খান বাদি হয়ে মামলা করেন। বিএনপি সরকারের আমলে ২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় তদন্ত কর্মকর্তা সৈয়দ মোমিন হোসেন। ছয়জন তদন্ত কর্মকর্তার হাত ঘুরে ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক মৃণাল কান্তি সাহা ১৩ আসামির বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন। ২০১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর হত্যা মামলায় অভিযোগ গঠনের পর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গতকাল এ রায় দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর সালাহউদ্দিন হাওলাদার সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই মামলা হিমাগার থেকে আমরা টেনে নিয়ে এসেছি। আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট।’
আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ বলেন, সিপিবি তেমন বড়ো কোনো দল নয়। তাদের তেমন কোনো কর্মীও নেই, দুর্বল পার্টি। তাদের সমাবেশে ছিল কিছু পুরনো, নষ্ট সাউন্ড সিস্টেম। নিজেরা আলোচনায় আসতেই নষ্ট ও পুরনো সাউন্ড সিস্টেম বিস্ফোরণের ঐ দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে বলে আমাদের পক্ষ থেকে আদালতকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু আসামিদের একজন ভারতে আটক হওয়ায় এবং দেশটির একটি সংবাদপত্রে ঐ আসামিকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ায় আদালত তা আমলে নিয়ে এই রায় দিয়েছেন।