দখল ও দূষণে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত

কুয়াকাটা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি সমুদ্রসৈকত ও পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটকদের নিকট ইহা ‘সাগরকন্যা’ হিসাবে খ্যাত। এই সৈকতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হইল এইখান হইতে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উভয়ই ভালোভাবে দেখা যায়। ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সৈকতটি বাংলাদেশের অন্যতম নৈসর্গিক, মনোরম ও দর্শনীয় স্থান। ইহার অদূরে রহিয়াছে ফাতরার বন, যাহা দ্বিতীয় সুন্দরবন হিসাবে পরিচিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকনসহ রহিয়াছে কিছু ঐতিহাসিক স্থানও। এই কারণে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের এত কাছে টানে, মুগ্ধ করে। কিন্তু ইদানীং কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত তাহার রূপ ও লাবণ্য হারাইতে বসিয়াছে। দখল ও দূষণে সৈকতটি হইয়া পড়িয়াছে বিপর্যস্ত। নানা অবৈধ স্থাপনার কারণে পর্যটকরা জিরো পয়েন্টের বাঁধ বা সড়কে দাঁড়াইয়া স্বাচ্ছন্দ্যে সাগর দেখিতে পারেন না। সৈকত লাগোয়া বিভিন্ন দোকানের ময়লা-আবর্জনায় সেখানকার পরিবেশ দূষিত, কলুষিত। অপরিচ্ছন্নতার কারণে অনেকে সপরিবারে কুয়াকাটা ভ্রমণে গিয়া হতাশ হইয়া ফিরিতেছেন। 

কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে স্থায়ী ও অস্থায়ী উভয় প্রকার স্থাপনাই তৈরি করা হইতেছে আইনকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করিয়া। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকিলেও বেড়িবাঁধের বাহিরে সৈকত লাগায়ো জমিতে গড়িয়া তোলা হইয়াছে অন্তত ২৫টি আবাসিক হোটেল। ২০১১ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনার পর পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন এখানে ২৮৮টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করিয়াছিল। কিন্তু মামলা জটিলতাসহ নানা কারণে তাহা আজও উচ্ছেদ করা সম্ভব হয় নাই। বেড়িবাঁধের বাহিরে সৈকত লাগোয়া কোনো জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন নহে। তাহার পরও সেইখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হইতেছে স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায়। পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের পথচলা খুব বেশি দিনের নহে। এখনই যদি এইখানে নিয়মকানুন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা না যায় এবং দখল ও দূষণের হাত হইতে সৈকতটি উদ্ধার না করা যায়, তাহা হইলে ভবিষ্যতে সৈকতটি হইয়া পড়িতে পারে পরিত্যক্ত ও আবর্জনার ভাগাড়। আমরা মনে করি, সমুদ্রসৈকতেও উন্নয়ন হইতে পারে। তবে এই উন্নয়ন হইতে হইবে পরিকল্পিত এবং পরিবেশ ও জনবান্ধব। নদী, খাল, জলাশয়, সৈকত যাহাই বলি না কেন, তাহা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করিতে হইবে। প্রয়োজনে সিএস পর্চা অনুসারে ইহার প্লাবন ও বেলাভূমি রক্ষায় আন্তরিক হইতে হইবে।

অভিযোগ রহিয়াছে, ১ লক্ষ হইতে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম নিয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিকট সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন স্থান ভাড়া দেওয়া হইতেছে। যাহারা এইভাবে অবৈধভাবে ভাড়া দিতেছে তাহাদের আইনের আওতায় আনিতে হইবে। কুয়াকাটাকে পরিকল্পিত পর্যটননগরী হিসাবে গড়িয়া তুলিতে হইলে এবং ইহার অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাইতে হইলে এইসব দখলদারদের নিকট হইতে সমুদ্রসৈকতটি রক্ষা করিতে হইবে। এখানে নূতন নূতন ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করা হইতেছে যাহা বন্ধ করিতে হইবে। কুয়াকাটা ভ্রমণপিপাসুদের নিকট একটি আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা। সুতরাং কোনো কারণে ইহা শ্রীহীন হইয়া পড়ুক—তাহা মোটেই কাম্য নহে।