ডা. ফাহমিদা ফেরদৌস
আজকের পৃথিবীতে ‘ভাষা সমস্যা’ এক অনিবার্য বাস্তবতা। পৃথিবীর সব সমাজেই ভাষা সমস্যায় আক্রান্ত শিশু পাওয়া যায়। ভাষা সমস্যা শুধু বর্তমান সময়ের সমস্যা নয়, বরং সব যুগেই এর অস্তিত্ব ছিল। যেহেতু ‘ভাষা সমস্যা’ বিষয়টি সম্পর্কে মানুষ তখন তেমনভাবে সচেতন ছিল না, সেহেতু এ ধরনের সমস্যা নিয়ে তাদের ভাবনার তেমন একটা অবকাশও ছিল না। তার একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে, তখন ভাষা সমস্যা ছাড়াও আরো অনেক তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক সমস্যাদি বর্তমান ছিল, যার দরুন সে-সময়কার মানুষ এ সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থাকার তেমন কোনো প্রয়োজনীয়তা বোধ করতেন না।
সাধারণভাবে ‘ভাষা সমস্যা’ অভিধাটি ইঙ্গিত করে এমন একটি ভাষিক অবস্থা, যার ফলে তার স্বাভাবিক ভাষাগত উপাদানসমূহের বিকাশ বা বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। শিশুর ভাষাগত সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু উপসর্গের দ্বারা প্রকাশ ঘটে এর মধ্যে অন্যতম উপসর্গ হলো শিশুর মানসিক ও আবেগগত বহিঃপ্রকাশের সমস্যা।
শিশুর ভাষা বিকাশের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতার দুটি মাত্রা আছে, একটি হচ্ছে ভাষা-বিলম্ব এবং অন্যটি হচ্ছে ভাষাবৈকল্য। এই দুটি মাত্রা ‘ভাষা সমস্যা’র সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। যদিও ভাষা সমস্যা বিষয়ে এ ধরনের পার্থক্য সব সময় পরিষ্কার নয় তথাপি এ দুটির সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো :
ভাষা বিলম্ব (Language delay) ভাষা বিলম্ব হচ্ছে ভাষা বিকাশের এমন একটি অবস্থা, যাতে শিশুর ভাষাগত উপাদানসমূহ যেমন—ধ্বনি, অক্ষর, শব্দ, বাক্য ইত্যাদি উপাদানের দেরিতে বিকাশ ঘটে। এ ধরনের ভাষা-বিলম্ব যদিও গুরুতর ভাষা সমস্যা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় না, তথাপি কোনো শিশুর মধ্যে যদি ভাষা বিলম্বের উপসর্গ পরিলক্ষিত হয়, তাহলে দেরি না করে যে কোনো মানসিক ও ভাষা বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া বাঞ্ছনীয়।
ভাষাবৈকল্য (Language disorder)
ভাষাবৈকল্য হচ্ছে ভাষা অনুধাবন ও ব্যবহার। বিশেষ করে বাচনিক এবং অবাচনিক এ সংক্রান্ত প্রতীকী চিহ্নসমূহের ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিকারগ্রস্ত একটি বিশেষ অবস্থা। শিশুর ভাষাবৈকল্য সাধারণত তার মস্তিষ্কের কোনো না কোনো অসম্পূর্ণতা বা ক্ষতির কারণে হয়ে থাকে। তবে শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি বা প্রদাহ যদি তার স্বাভাবিক ভাষা বিকাশের পরে হয় এবং এ কারণে ভাষা সমস্যা দেখা দেয়, তখন এ ধরনের ভাষাবৈকল্যকে অর্জিত ভাষাবৈকল্য (Acquired language disorder) বলা হয়। আর মস্তিষ্কের অসম্পূর্ণতা বা অদৃশ্য ক্ষতি যদি শিশু তার জন্মের সময় নিয়ে আসে এবং তার ফলে শিশুর ভাষা সমস্যা দেখা যায়, তখন তাকে বর্ধনমূলক ভাষাবৈকল্য (Developmental language disorder) বলা হয়।
উল্লিখিত মাত্রা দুটি ‘ভাষা সমস্যা’র সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। নিম্নে কারণগুলোকে বিষয়ভিত্তিক আকারে সাজিয়ে প্রকাশ করা হলো—
১. বংশগত বা জন্মকালীন কারণ :২. চিকিত্সাবিজ্ঞানগত কারণ :৩. পারিবারিক/পরিবেশগত কারণ :
নিম্নে উপসর্গগুলি লিপিবদ্ধ করা হলো :১. মানসিক এবং আবেগগত বহিঃপ্রকাশের সমস্যা। (Behavioral problem) ২. সরাসরি বক্তার দিকে মুখ তুলে চোখে চোখে (Eye contact) না তাকানো। ৩. ভাষা অনুধাবনের ক্ষেত্রে (Reception of language/conceptual domain) তাত্পর্যপূর্ণ ঘাটতি। ৪. শিশুর আয়ত্তকৃত শব্দের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বিশেষ করে, ‘যাই’, ‘করি’, ‘খাই’ ইত্যাদি পরিচিত ক্রিয়াপদ ব্যতীত বৈচিত্র্যময় ক্রিয়াপদের সংখ্যা নেই বললেই চলে। ৫. সংলাপ (Conversation) চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা। ৬. সমবয়সিদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ (Peer relationship) হতে সমস্যা। ৭. কিছু স্বরের পুনঃপুন অনুকরণ (Imitative Babble)। ৮. প্রতীকী খেলা (Symbolic play) খেলতে অসমর্থ।
একটি স্বাভাবিক শিশুর চার-পাঁচ বছরের মধ্যে মৌলিক ভাষা সমন্বয় ভিত্তি (Basic Language Development) গঠিত হয়ে যায়, তবে আয়ত্তকরণ শব্দাবলির প্রক্রিয়াটি পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পরও চলতে থাকে। কেননা আমরা ঐ সময়কালে বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানগত ধারণা ও বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হই, যেগুলি ক্রমাগত আমাদের শব্দ সম্ভারকে (Mental lexicon) সমৃদ্ধ করতে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে, যদি কোনো শিশু চার-পাঁচ বছরের মধ্যে দৈনিক ৫-১০টি শব্দ দিয়ে পরিবেশ (Situation) ও প্রতিবেশ (Context) অনুযায়ী মনের ভাব প্রকাশ করতে না পারে, তাহলে তা আশঙ্কাজনক বা উদ্বেগজনক লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।
n লেখক :চিকিত্সা ভাষাবিদ এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক, জেড এইচ সিকদার উইমেন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল