মুজিব শতবর্ষে প্রথম মৃতদেহ থেকে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ

 ‘একটি মৃতদেহের অঙ্গ প্রতিস্থাপনে আট জনের জীবন বাঁচানো যেতে পারে’

g ইত্তেফাক রিপোর্ট

অসচেতনতা আর ধর্মীয় গোড়ামির কারণে এখনো দেশে মৃত্যুর পরে শরীর থেকে অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। যদিও উন্নত বিশ্বে মৃত্যুর পর অঙ্গ প্রতিস্থাপন বহুল প্রচলিত একটি প্রক্রিয়া। তবে মুজিব শতবর্ষে এবার সেই উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা। মঙ্গলবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘মরণোত্তর দেহদান ও সংযোজন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। কিডনি ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন, সোসাইটি অব অর্গান ট্রান্সপ্লান্টেশন ও ইউরোলজি অ্যান্ড ট্রান্সপ্লান্টেশন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য কনক কান্তি বড়ুয়া মরণোত্তর দেহদানবিষয়ক আইন প্রণয়নের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, মরণোত্তর অঙ্গদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়; যদিও অনেক দেরিতে এটির কাজ শুরু হচ্ছে। এ জন্য সবার সহযোগিতা দরকার। মরণোত্তর দেহদান নিয়ে মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা সচেতনতা তৈরির কাজ করতে পারেন।

বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও বিএসএমএমইউর সহ-উপাচার্য রফিকুল আলম বলেন, উন্নত বিশ্বে ৯০ ভাগ কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে। মৃতদেহ থেকে অঙ্গ নিয়ে প্রতিস্থাপনের জন্য মরণোত্তর দেহদানবিষয়ক আইনের আলোকে জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি কিছু প্রস্তাব সরকারকে দিয়েছে, যাতে মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ে। এতদিন জীবিত মানুষের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হলেও, এখন মৃতদেহ থেকে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা চালাচ্ছি।

মরণোত্তর অঙ্গদান ও সংযোজন নিয়ে কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক হারুন আর রশিদ বলেন, বাংলাদেশে মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে অঙ্গ প্রতিস্থাপন এখনো শুরু হয়নি। ধর্মীয় দিক চিন্তা করে মানুষ এটা করেন না। কিন্তু এর জন্য সচেতনতা দরকার। এটাই সবচেয়ে বড়ো প্রয়োজন। যারা মরণোত্তর অঙ্গদান করবেন, তাদের উচ্চ মর্যাদায় স্থান দিতে হবে। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে মৃতদেহ থেকে অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়ে থাকে। একটি মৃতদেহের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মধ্য দিয়ে আট জনের জীবন বাঁচানো যেতে পারে। মৃতদেহের ফুসফুস, হূিপন্ড, যকৃত্, মূত্রগ্রন্থি, অগ্ন্যাশয় ও খাদ্যনালির নিম্নাংশ প্রতিস্থাপন করা সম্ভব।

সোসাইটি অব অর্গান ট্রান্সপ্লান্টেশন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বলেন, ১৯৮২ সাল থেকে বাংলাদেশে কিডনি সংযোজন ও ডায়ালাইসিস সেবা চালু আছে। দিনে দিনে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অথচ অপ্রতুল কিডনির অভাবে রোগীরা কিডনি প্রতিস্থাপন করতে পারছেন না। সৌদি আরব ও ইরানে মরণোত্তর কিডনি দানের অসংখ্য উদাহরণ আছে। তিনি বলেন, প্রতিবছর বিশ্বে ২ কোটি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ৪০ হাজার মানুষের কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায়। কেবল ২০ ভাগ মানুষ কিডনি রোগের চিকিত্সা পায়। বাকিরা চিকিত্সার বাইরে থাকে। উন্নত বিশ্বে ৬০ ভাগ রোগী মরণোত্তর কিডনি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে নতুন জীবন ফিরে পাচ্ছে।

ইউরোলজি অ্যান্ড ট্রান্সপ্লান্টেশন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক এম এ সালাম বলেন, মরণোত্তর অঙ্গদান বহু মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়ক হবে। এর জন্য প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা। যারা অঙ্গদান করবেন, তাদের জাতীয়ভাবে মর্যাদা দেওয়া হলে এটি আরো মানুষের মধ্যে উত্সাহ বাড়াবে। সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন যুক্তরাষ্ট্রের ড্রেক্সেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন আহমেদ, বিএসএমএমইউর অধ্যাপক এ কে এম আক্তারুজ্জামান, অধ্যাপক এ কে এম খুরশিদুল আলম প্রমুখ।