মানব চিকিত্সাবিজ্ঞানে কিছু ম্যাজিক সংখ্যা রহিয়াছে, যাহা স্ট্যান্ডার্ড হিসাবে বহু বত্সর ধরিয়া মানিয়া লওয়া হয়। তেমনই একটি ম্যাজিক সংখ্যা হইল আমাদের দেহের আদর্শ তাপমাত্রা—যাহা ৯৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট। এখন হইতে ১৬০ বত্সর পূর্বে জার্মান চিকিত্সক ভান্ডারলিচ ২৫ হাজার রোগীর দেহের তাপমাত্রা মাপিয়াছিলেন বগলের তাপমাত্রা লইয়া, যাহাকে চিকিত্সাবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয়, ‘অ্যাক্সিলারি টেম্পারেচার’। কী আশ্চর্য! সেই তাপমাত্রা নাকি এখন আর আদর্শ নহে! মানবদেহের আদর্শ তাপমাত্রা নাকি কমিয়া গিয়াছে প্রায় ১ দশমিক ১ ডিগ্রি ফারেনহাইট! অর্থাত্, মানুষ আরো শীতল হইয়াছে। আর পুরুষ শীতল হইয়াছে নারীর তুলনায় অধিক। নারীদেহের আদর্শ তাপমাত্রা এখন ৯৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘ইলাইফ’-এর নূতন সংখ্যায় প্রকাশিত হইয়াছে এই সংক্রান্ত গবেষণাপত্র।
ইহা ঠিক যে, জীবন মানেই উষ্ণতা। আর শীতলতা হইল মৃত্যুর প্রতীক। কারণ মৃত্যুতে প্রাণীর শরীর তাপমাত্রা হারায়। বিস্ময়করভাবে, অঙ্কের হিসাবে দেখা গিয়াছে এই হারে যদি আমাদের দেহের তাপমাত্রার পারদ নামিতে থাকে, তাহা হইলে সাড়ে ১৪ হাজার বত্সর পর আমাদের দেহের তাপমাত্রা হইতে পারে শূন্য ডিগ্রি ফারেনহাইট। তাহা হইলে আমরা কি দূর ভবিষ্যতে সাপের মতো শীতল রক্তের প্রাণী হইব? ইহা অবশ্য নিরেট অঙ্কের সরল হিসাব। আর প্রাণীর শরীর হইল অতি জটিল ও সূক্ষ্ম একটি যন্ত্র, যেইখানে প্রতিটি ধাপে অসংখ্য শর্ত জড়িত থাকে ওতপ্রোতভাবে। তাহাতে পালটাইয়াও যায় দেহের হিসাবনিকাশ। সেই হিসাবে বলা হইতেছে, ১৬০ বত্সরে মানবদেহের তাপমাত্রা কমিয়াছে মূলত অধিক আয়ু ও আধুনিক জীবনের বদান্যতায়। সেই সময় মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৩৮ বত্সর। যক্ষ্মা হইতে সিফিলিস এবং নানা রকমের প্রদাহে তখন অহরহ মৃত্যু হইত মানুষের। মানুষ বিভিন্ন রকমের প্রদাহে বেশি আক্রান্ত হয় অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সে। তাহার ফলে এই বয়সের সীমারেখায় দেহের গড় স্বাভাবিক তাপমাত্রা বাড়িয়া যায়। অন্যদিকে বয়স বাড়িবার পাশাপাশি দেহের গড় স্বাভাবিক তাপমাত্রা কমিয়া যায়। এই কারণে তরুণ প্রজন্মের গা প্রবীণদের তুলনায় বেশি গরম। গবেষকরা বলিতেছেন আরো একটি কারণের কথা। আমাদের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া ও বিপাক প্রক্রিয়ার হার কমবেশির কারণে দেহের তাপমাত্রাও উঠানামা করে। এই জন্য ছোটাছুটি বা ব্যায়াম করিলে অথবা অধিক পরিশ্রম করিলে শরীরে বিপাকীয় হার বাড়ে। আগেকার মানুষকে অনেক বেশি পরিশ্রম করিতে হইত। ফলে, তাহাদের বিপাক ও অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার হার ছিল অনেক বেশি। তাই তাহাদের দেহের গড় স্বাভাবিক তাপমাত্রাও ছিল বেশি; কিন্তু আধুনিক জীবনের কারণে আমরা এখন অনেক বেশি আয়েশি, যন্ত্রনির্ভর। এই কারণে আমাদের বিপাকীয় হারও কম।
দেহের তাপমাত্রা এই হ্রাসের বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হইলেও ইহার তাত্পর্য কম নহে। আধুনিক সভ্যতা তথা যন্ত্রনির্ভরতা মানবদেহের উপরও কী ব্যাপক প্রভাব ফেলিতেছে, দেহের তাপমাত্রা কমিয়া যাইবার ঘটনাটি তাহারই একটি বড়ো উদাহরণ। ইহা ভালো কি মন্দ—তাহা অবশ্য অন্য বিতর্ক। আমাদের দেহ শীতল হইতেছে বটে; কিন্তু মন কি শীতল হইতেছে?